
নিজস্ব প্রতিবেদক আগামী ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জন্য প্রায় ৯ লাখ কোটি টাকার জাতীয় বাজেট প্রস্তুত করছে সরকার। অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, বাজেটের সম্ভাব্য আকার হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৯৩ হাজার কোটি টাকা বেশি। তবে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বড় বাজেট প্রণয়ন নয়—এর বাস্তবায়ন সক্ষমতাই হবে মূল পরীক্ষা।
বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে উচ্চ মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান সংকট, বিনিয়োগ স্থবিরতা এবং রাজস্ব ঘাটতির মতো চ্যালেঞ্জ সামনে রেখে বাজেট প্রণয়ন করা হচ্ছে। গত কয়েক বছরে খাদ্যপণ্য, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় চাপ বেড়েছে। একই সঙ্গে শ্রমবাজারে প্রবেশ করা বিপুল সংখ্যক তরুণের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় বেকারত্ব ও আংশিক বেকারত্ব বাড়ছে।
এই প্রেক্ষাপটে আগামী বাজেটে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ গঠনে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি শিক্ষা, প্রযুক্তি দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। নীতিনির্ধারকদের মতে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হলে দেশে শিল্প ও সেবা খাতে কর্মসংস্থান বাড়ার পাশাপাশি বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগও বাড়বে, যা রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) মনে করছে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব ঘাটতি মোকাবিলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি আগামী বাজেটের প্রধান চ্যালেঞ্জ। প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত মুহূর্ত, যেখানে স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপের পাশাপাশি মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারের ভিত্তি শক্ত করা জরুরি।
তিনি উল্লেখ করেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণের ধীরগতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, নিম্ন বিনিয়োগ এবং সীমিত কর্মসংস্থান—সব মিলিয়ে অর্থনীতি বহুমুখী চাপে রয়েছে। এর পাশাপাশি আর্থিক খাতের অস্থিরতা এবং রফতানি প্রবৃদ্ধির শ্লথগতি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণও একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে রয়েছে।
রাজস্ব ও ব্যয়ের ভারসাম্য
প্রস্তাবিত বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হতে পারে ৮ লাখ ৮৩ হাজার কোটি টাকা, বিপরীতে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য প্রায় ৬ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে কর রাজস্ব ৫ লাখ ৭১ হাজার কোটি এবং অ-কর রাজস্ব ৬৫ হাজার কোটি টাকা হতে পারে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে কর আদায়ের লক্ষ্য ধরা হচ্ছে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা।
তবে জিডিপির তুলনায় কর আদায়ের হার এখনও কম থাকায় রাজস্ব সংগ্রহ বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবেই থাকছে। এ কারণে করজাল সম্প্রসারণ, কর প্রশাসনের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং কাঠামোগত সংস্কারের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
উন্নয়ন ব্যয় ও এডিপি
বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ধরা হতে পারে প্রায় ২ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। অবকাঠামো, যোগাযোগ, জ্বালানি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দ থাকতে পারে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা ও কার্যকারিতা বিবেচনায় নিয়ে নতুন প্রকল্প অনুমোদনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে, যাতে অতীতের দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যয় বৃদ্ধি এড়ানো যায়।
বাজেট ঘাটতি ও ঋণের চাপ
প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ২ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা জিডিপির প্রায় ৩.৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে। ব্যাংক খাত থেকে বেশি ঋণ নিলে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গিয়ে বিনিয়োগে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন।
প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য
আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হতে পারে প্রায় ৬ শতাংশ। এ হিসেবে দেশের মোট অর্থনীতির আকার দাঁড়াতে পারে প্রায় ৬৮ লাখ ৭০৭ কোটি টাকা বা প্রায় ৫৪৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। তবে এই লক্ষ্য অর্জনে বেসরকারি বিনিয়োগ, রফতানি সম্প্রসারণ এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মত বিশ্লেষকদের।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাত
মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও বরাদ্দ এখনও তুলনামূলক কম। শিক্ষা খাতে জিডিপির প্রায় ২–২.৫ শতাংশ এবং স্বাস্থ্য খাতে সীমিত সরকারি ব্যয় দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। ফলে এ দুই খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধি এবং ব্যয়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা উঠে এসেছে।
প্রাক-বাজেট আলোচনা
জাতীয় রাজস্ব বোর্ড প্রাক-বাজেট আলোচনা শুরু করতে যাচ্ছে ৩১ মার্চ, যা চলবে ২৮ এপ্রিল পর্যন্ত। এতে ব্যবসায়ী সংগঠন, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, পেশাজীবী ও সাংবাদিকরা অংশ নিয়ে বাজেট সংক্রান্ত প্রস্তাব ও সুপারিশ তুলে ধরবেন। এসব মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্তির বিষয় বিবেচনা করা হবে।
বাস্তবায়নই মূল পরীক্ষা
সার্বিকভাবে আসন্ন বাজেটকে পুনরুদ্ধারমুখী হিসেবে দেখা হলেও এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর। রাজস্ব সংস্কার, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি, সুশাসন ও জবাবদিহি নিশ্চিতকরণ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি—এই চারটি বিষয়েই নির্ধারিত হবে বাজেটের সাফল্য বা ব্যর্থতা।











