
আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের গুরুত্বপূর্ণ জলপথ হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় ভারতের জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রবাসী কর্মসংস্থান এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের ওপর সম্ভাব্য চাপ তৈরি হয়েছে। ভারতের তেল, গ্যাস ও অন্যান্য কাঁচামালের বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে আমদানি হওয়ায় পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে দেশের অর্থনীতি ও শিল্পখাতে প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
ভারতের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় অর্ধেক এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি ও রান্নার গ্যাস এলপিজির উল্লেখযোগ্য অংশ হরমুজ প্রণালি হয়ে দেশে পৌঁছে। সংঘাতের কারণে এ পথে সরবরাহ ব্যাহত হলে জ্বালানি খাতে চাপ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বর্তমানে ভারতের কাছে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে এবং প্রয়োজনে বিকল্প উৎস থেকে তেল আমদানির সুযোগ রয়েছে। তবে এলপিজি ও এলএনজির সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ বেশি বলে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন।
ভারতের রান্নার গ্যাসের চাহিদার প্রায় ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ আমদানিনির্ভর। কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এ ক্ষেত্রে প্রধান সরবরাহকারী দেশ। সরবরাহে দীর্ঘ সময় বিঘ্ন ঘটলে গৃহস্থালি গ্যাস ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার কারখানা এবং শিল্পখাতের একটি বড় অংশ এলএনজির ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ কমে গেলে উৎপাদন কার্যক্রমে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ব্রোকারেজ প্রতিষ্ঠান জেফরিসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রতি ব্যারেলে ১০ ডলার বাড়লে ভারতের মুদ্রাস্ফীতি প্রায় শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।
মধ্যপ্রাচ্য ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজারও। উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ জিসিসিভুক্ত ছয়টি দেশে প্রায় এক কোটি ভারতীয় প্রবাসী বসবাস করেন, যা দেশটির মোট প্রবাসীর প্রায় অর্ধেক। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারত প্রায় ১৩৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স অর্জন করেছে, যার প্রায় ৩৮ শতাংশ এসেছে এই অঞ্চল থেকে।
সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হলে প্রবাসী কর্মীদের কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজন হলে বিপুলসংখ্যক নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়টি ভারতের জন্য একটি বড় লজিস্টিক চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এতে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার পাশাপাশি দেশের শ্রমবাজারেও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ইসরায়েল ও ইরানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক থাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশটি সতর্ক অবস্থান অনুসরণ করছে। পর্যবেক্ষক রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিশ্লেষক হর্ষ ভি পান্ত তথ্য দিয়েছেন যে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ নীতি অনুসরণ করছে এবং আঞ্চলিক পরিস্থিতির উন্নয়ন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালিতে সরবরাহ ব্যবস্থা দীর্ঘ সময় ব্যাহত হলে জ্বালানি খাতের পাশাপাশি ভারতের সার শিল্প, প্লাস্টিক, নির্মাণ এবং হীরা প্রক্রিয়াজাত শিল্পসহ বিভিন্ন উৎপাদন খাতেও প্রভাব পড়তে পারে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প জ্বালানি উৎস অনুসন্ধান এবং বিদেশে কর্মরত নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রাধিকার হয়ে উঠতে পারে বলে পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।










