বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আইএমএফের চলমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি হিসেবে প্রায় ১৩০ কোটি ডলার আগামী জুন মাসে পেতে পারে। তবে এ অর্থ ছাড়ের আগে সরকারকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্কার কার্যক্রমে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখাতে হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
এর মধ্যে রয়েছে বিনিময় হার আরও বাজারভিত্তিক করা, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো, ভর্তুকি ধীরে ধীরে কমানো এবং ব্যাংক খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা। এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেই সংস্থাটির এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ২৩ মার্চ দুই দিনের সফরে ঢাকায় আসছে।
আইএমএফের প্রতিনিধিদলের ঢাকায় আসার আগে রবিবার (১৫ মার্চ) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সঙ্গে সৌজন্য বৈঠক করেন সংস্থাটির আবাসিক প্রতিনিধি ম্যাক্সিম ক্রিশকো। এর আগে তিনি ১৩ মার্চ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গেও সৌজন্য বৈঠক করেন।
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক
ঢাকা সফরকালে প্রতিনিধিদল প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করবে।
এই বৈঠকে মূলত চলমান ঋণ কর্মসূচির অগ্রগতি, সংস্কার বাস্তবায়নের গতি এবং নতুন সরকারের অর্থনৈতিক অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, আইএমএফ মূলত নতুন সরকারের কাছ থেকে কর্মসূচি বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার সম্পর্কে স্পষ্ট বার্তা জানতে চাইবে।
এ ছাড়া আগামী এপ্রিল মাসে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠেয় আইএমএফ–বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভার পার্শ্ব বৈঠকেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর নিয়মিত আইএমএফ মিশন ঢাকায় এসে পরবর্তী কিস্তি ছাড়ের আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া এগিয়ে নিতে পারে।
সাড়ে ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচি
বাংলাদেশের জন্য আইএমএফের এই ঋণ কর্মসূচি অনুমোদিত হয় ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে। শুরুতে এর পরিমাণ ছিল ৪৭০ কোটি ডলার। পরে ২০২৪ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের অনুরোধে তা বাড়িয়ে ৫৫০ কোটি ডলারে উন্নীত করা হয়।
সাত কিস্তিতে এই অর্থ ছাড়ের কথা রয়েছে। এর মধ্যে গত বছরের জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রায় ৩৬৫ কোটি ডলার পেয়েছে। তবে পঞ্চম পর্যালোচনার পর গত বছরের নভেম্বর থেকে নতুন কিস্তি ছাড় স্থগিত রয়েছে।
আইএমএফের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, কর্মসূচির বাস্তবায়নে অগ্রগতি কিছু ক্ষেত্রে হয়েছে, আবার কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়েছে। বিশেষ করে রাজস্ব আহরণ নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হয়েছে। একইসঙ্গে ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের উচ্চপর্যায়ের কৌশল এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও কর্মসূচির শর্ত পুরোপুরি অনুসরণ করা হয়নি বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে।
তবে কিছু ইতিবাচক অগ্রগতিও রয়েছে। যেমন- প্রাথমিক বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে কিছুটা উন্নতি হয়েছে, আন্তর্জাতিক পেমেন্ট বকেয়া কমেছে এবং কোয়াসি-ফিসকাল ঋণের সীমা মেনে চলা হয়েছে। যদিও বাজেট ঘাটতির লক্ষ্য অর্জনে উন্নয়ন ও সামাজিক খাতে ব্যয় কমানো হয়েছে বলে আইএমএফ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।
সরকারের অবস্থান
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আইএমএফের ঋণ কর্মসূচির আওতায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত পূরণ করেছে। তবে এখনও কয়েকটি বিষয়ে অগ্রগতি প্রয়োজন রয়েছে।
তাদের মতে, চলতি মাসে আইএমএফের একটি প্রতিনিধি দল ঢাকা সফরে আসছে। এই সফরে সরকারের সঙ্গে তাদের বিস্তারিত আলোচনা হবে এবং ওই আলোচনার ফলাফলের ওপরই পরবর্তী অগ্রগতি অনেকাংশে নির্ভর করবে।
কর্মকর্তারা বলেন, সরকারের নিজস্ব অর্থনৈতিক নীতি ও উন্নয়ন অগ্রাধিকার রয়েছে। তাই আইএমএফের সঙ্গে আলোচনার সময় দেশের সামষ্টিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তারা আরও জানান, আইএমএফের আর্থিক সহায়তা অর্থনীতির স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এর সঙ্গে বিভিন্ন নীতিগত সংস্কারের শর্ত যুক্ত থাকে। সে কারণে এসব শর্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে— দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, সামাজিক প্রভাব এবং নীতিগত অগ্রাধিকারের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা।
কর্মসূচি চালু রাখার পরামর্শ
অর্থনীতিবিদদের মতে, বর্তমান বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার সময়ে আইএমএফ কর্মসূচি চালু রাখা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষিণ এশীয় নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম রায়হান বলেন, আইএমএফ কর্মসূচি সফলভাবে শেষ করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তার মতে, গত বছর আলোচনায় স্থবিরতার অন্যতম কারণ ছিল নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে আলোচনার অপেক্ষা এবং সংস্কার কার্যক্রমের ধীরগতি— বিশেষ করে কর আহরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়া।
তিনি সতর্ক করে বলেন, আইএমএফের মূল্যায়ন দুর্বল হলে অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাও অর্থায়নের ক্ষেত্রে সতর্ক হয়ে যায়। ফলে বহুপাক্ষিক ঋণ ও বাজেট সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রভাব পড়তে পারে।
বৈশ্বিক ঝুঁকির প্রভাব
অর্থনীতিবিদরা আরও বলছেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য কিছু ঝুঁকি তৈরি করছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের চলমান উত্তেজনা বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়াতে পারে।
এর ফলে আমদানি ব্যয় বাড়া, রফতানি বাজারে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়া কিংবা রেমিট্যান্স প্রবাহে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। এসব কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে আইএমএফের অবশিষ্ট অর্থ অর্থনীতিকে সহায়তা করতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তাৎপর্যপূর্ণ সফর
বিশেষজ্ঞদের মতে, আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসনের ঢাকা সফর অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হতে যাচ্ছে আইএমএফের সঙ্গে সর্বোচ্চ পর্যায়ের প্রথম সরাসরি আলোচনা।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, “নতুন সরকার এসেছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতিও অনিশ্চিত। ফলে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আইএমএফের এবারের বৈঠকটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমি মনে করি, ঋণ কর্মসূচিটির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা দরকার।”
তার মতে, বাংলাদেশ চাইলে একই কর্মসূচির আওতায় আরও সময় বা অতিরিক্ত অর্থ সহায়তার বিষয়েও আলোচনা করতে পারে।
রাজস্ব সংস্কারই বড় চ্যালেঞ্জ
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) তুলনায় রাজস্ব আহরণের হারে বাংলাদেশ এখনও বিশ্বের নিম্নতম দেশগুলোর একটি।
অনেক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে কর প্রদান করছেন না। ফলে রাজস্ব সংগ্রহ বাড়াতে ভ্যাট কাঠামো পুনর্বিন্যাস, করমুক্তির সুযোগ সীমিত করা এবং ন্যূনতম টার্নওভার কর বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্ব সংগ্রহ উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে অবকাঠামো উন্নয়ন, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি এবং সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়বে।
সব মিলিয়ে বলা যায়, আইএমএফের সঙ্গে আসন্ন আলোচনা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। আলোচনা সফল হলে জুন মাসে পরবর্তী কিস্তির অর্থ ছাড়ের পথ খুলে যেতে পারে, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতায় সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে।
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.