
নিজস্ব প্রতিবেদক:সাদা মার্বেলের ঝলমলে আভা, দৃষ্টিনন্দন গম্বুজ ও সুউচ্চ মিনারের সমন্বয়ে সিরাজগঞ্জের বেলকুচি উপজেলায় দাঁড়িয়ে আছে নান্দনিক স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ। আধুনিক স্থাপত্যশৈলী ও ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক নকশার মিশেলে নির্মিত এই মসজিদ এখন শুধু ইবাদতের স্থান নয়, বরং স্থাপত্য সৌন্দর্যের জন্যও ব্যাপকভাবে পরিচিত হয়ে উঠেছে।
দূর থেকেই চোখে পড়ে সাদা মার্বেলে মোড়া বিশাল গম্বুজ ও সুউচ্চ মিনার। সূর্যের আলো পড়লে পুরো স্থাপনাটি যেন ঝলমল করে ওঠে। ভোরের কোমল আলো কিংবা বিকেলের শেষ রোদে মসজিদের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যা দর্শনার্থীদের মনে প্রশান্তির অনুভূতি জাগায়।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বেলকুচি উপজেলার মনোরম পরিবেশে নির্মিত এই মসজিদটি এখন এলাকার অন্যতম আকর্ষণীয় স্থাপনা। মসজিদটির সৌন্দর্য দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লি ও দর্শনার্থীরা এখানে আসেন। এটি সিরাজগঞ্জ-এনায়েতপুর আঞ্চলিক সড়কের মুকন্দগাঁতী এলাকায় অবস্থিত।
আধুনিক নির্মাণশৈলীর কারণে মসজিদটি ইতোমধ্যে একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। ছুটির দিনগুলোতে এখানে দর্শনার্থীদের উপস্থিতি বেশি দেখা যায়। অনেকেই মসজিদের সামনে ছবি তুলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেন। স্থানীয়দের মতে, এই মসজিদ নির্মাণের পর থেকে বেলকুচি উপজেলার পরিচিতিও বেড়েছে।
মসজিদ কমিটি সূত্রে জানা যায়, প্রায় আড়াই বিঘা জমির ওপর নির্মিত মসজিদটির নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৬ সালে। রহমত গ্রুপের চেয়ারম্যান প্রয়াত শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার নিজ উদ্যোগে ইসলামিক নকশায় এর পরিকল্পনা করেন। প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে টানা সাড়ে চার বছর ধরে প্রতিদিন প্রায় ৪৫ জন শ্রমিকের পরিশ্রমে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয়।
মসজিদটির মিনারের উচ্চতা প্রায় ১১০ ফুট এবং পুরো স্থাপনার আয়তন প্রায় ৩১ হাজার বর্গফুট। মসজিদের দেয়ালে আয়াতুল কুরসি, সূরা আর-রহমানসহ পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত খচিত রয়েছে। ছোট ছোট গম্বুজ, মিনারের নকশা, রঙিন পাথর ও কারুকাজে পুরো মসজিদ কমপ্লেক্সটি নান্দনিক রূপ পেয়েছে।
মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা শিল্পপতি মোহাম্মদ আলী সরকার তার ছেলে আল-আমান এবং মা বাহেলা খাতুনের নামে ‘আল-আমান বাহেলা খাতুন জামে মসজিদ’ নামকরণ করেন। ২০২০ সালের আগস্টে তার মৃত্যুর পর মসজিদের নির্মাণকাজ এগিয়ে নেন তার ছেলে আল-আমান।
মসজিদ কর্তৃপক্ষ জানায়, মসজিদের ভেতরে একসঙ্গে প্রায় সাত হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। ভেতরের স্থান ও আঙিনা মিলিয়ে প্রায় আট হাজার মুসল্লির নামাজের ব্যবস্থা রয়েছে। ইতালি ও ভারত থেকে আনা উন্নতমানের মার্বেল পাথর এবং কাঠের কারুকাজে মসজিদের বিভিন্ন অংশ সজ্জিত করা হয়েছে।
মসজিদের খাদেম আব্দুল মান্নান জানান, ২০২৪ সালের ২ এপ্রিল জুমার নামাজের মধ্য দিয়ে মসজিদটি আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। এখানে বর্তমানে দুইজন ইমাম, চারজন খতিব ও ছয়জন খাদেম দায়িত্ব পালন করছেন। মসজিদের ভেতরে ছাই রঙের বিশাল গম্বুজ, ঝকঝকে সাদা টাইলস এবং মার্বেল পাথরে মোড়ানো পিলার রয়েছে। তৃতীয় তলায় গম্বুজের কাছে এবং বিভিন্ন স্থানে চীন থেকে আনা ঝাড়বাতি স্থাপন করা হয়েছে।
মসজিদের চারপাশে সাদা পিলার, সুউচ্চ জানালা এবং সবুজ ঘাসের পরিকল্পিত বাগান পুরো পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। রাতে রঙিন আলোকসজ্জায় সৃষ্টি হয় ভিন্ন আবহ। ব্যস্ত সড়কের পাশে অবস্থান করলেও মসজিদ চত্বরে রয়েছে শান্ত ও প্রশান্ত পরিবেশ।
মসজিদ নির্মাণকালে দায়িত্বে থাকা আলমগীর হোসেন জানান, ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের থাকার জন্য মসজিদের পাশে পৃথক কোয়ার্টার, পাঠাগার ও শৌচাগারের ব্যবস্থা রয়েছে। মুসল্লিদের সুবিধার্থে প্রবেশপথের সিঁড়ির পাশে কাঁচে ঘেরা অটো-ফিল্টার পানির মাধ্যমে ওজুর ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
মসজিদের খতিব ড. খলিলুর রহমান ও ইমাম মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, নান্দনিক স্থাপত্য ও ধর্মীয় আবহের সমন্বয়ে এই মসজিদ এখন আধ্যাত্মিকতা ও সৌন্দর্যের এক অনন্য নিদর্শন। আধুনিক নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহ্যবাহী ইসলামিক স্থাপত্যের সমন্বয়ে নির্মিত হওয়ায় এটি ইতোমধ্যে দর্শনার্থীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।











