মোঃ: আসাদুল্লাহ,(চৌহালী) সিরাজগঞ্জ: সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলা–এর দুর্গম চরাঞ্চল, বিশেষ করে উমারপুর ইউনিয়ন–এ চিকিৎসাসেবা আজও অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাস্তবতা। ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবন থাকলেও কার্যকর চিকিৎসা সেবা না থাকায় চরবাসী বাধ্য হচ্ছেন দূরবর্তী হাসপাতালের পথে ছুটতে—কখনো টাঙ্গাইল, কখনো ঢাকা, আবার কখনো পাবনা বা এনায়েতপুর পর্যন্ত।
দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, নদীপথের ঝুঁকি এবং অতিরিক্ত খরচ—সব মিলিয়ে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছানো অনেক পরিবারের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। ফলে চিকিৎসার অভাবে প্রাণহানির ঘটনা এলাকাবাসীর কাছে অস্বাভাবিক নয়, বরং নিত্যদিনের বাস্তবতা।
প্রসূতি ও নবজাতক সবচেয়ে ঝুঁকিতে
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা যায় গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে। স্থানীয়দের ভাষ্যে, প্রসববেদনা উঠলে পরিবারকে প্রথমে ভাবতে হয়—কীভাবে হাসপাতালে নেওয়া যাবে? শুকনো মৌসুমে একমাত্র ভরসা ঘোড়ার গাড়ি; বালুময়, অসমতল পথ পেরিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যাত্রা। আর বর্ষা মৌসুমে পুরো এলাকা পানিতে তলিয়ে গেলে ভরসা শুধু নৌকা। গভীর রাত বা বৈরী আবহাওয়ায় এই যাত্রা হয়ে ওঠে জীবনসংকটের সমান।
একজন স্বজনের কণ্ঠে ধরা পড়ে বাস্তবতার নির্মমতা—
“প্রসব ব্যথা উঠলে আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করি। শুকনো মৌসুমে ঘোড়ার গাড়ি, আর বর্ষায় নৌকাই আমাদের একমাত্র ভরসা। সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে পারবো কিনা—সেটাই সবচেয়ে বড় ভয়।
এই ভয় শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি উমারপুরের অসংখ্য মায়ের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে প্রসবকালীন জটিলতায় মায়ের মৃত্যু ঘটে। আবার কোথাও মা বেঁচে গেলেও নবজাতককে হারানোর বেদনা বইতে হয় পরিবারকে।
স্বাস্থ্যকেন্দ্র আছে, সেবা নেই এই বিষয়ে জানতে চাইলে,
উমারপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের পরিদর্শক মো. ইলিয়াস হোসেন জানান, এটি মূলত পরিবার পরিকল্পনা ও সাধারণ রোগীদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার কেন্দ্র। তবে এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ হওয়ায় সরকারিভাবে যে পরিমাণ ওষুধ সরবরাহ করা হয়, তা ছয়-সাত দিনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি পদ—উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (SACMO), FWV, আয়া ও অফিস সহায়ক—দীর্ঘদিন শূন্য। বর্তমানে একজন ফার্মাসিস্ট একাই সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
ভবনের দেয়াল ক্ষয়প্রাপ্ত, বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে, নিয়মিত ওষুধ সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে। যদিও কেন্দ্রটি সরকারি ছুটি ব্যতীত প্রতিদিন খোলা থাকে, তবুও পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা সেবা দেওয়ার সক্ষমতা নেই।
রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা
বাংলাদেশ–এর স্বাস্থ্যখাতে উন্নয়নের নানা পরিসংখ্যান থাকলেও উমারপুরের চরবাসীর কাছে সেই অগ্রগতি এখনও অদৃশ্য। নবজাতকের প্রথম কান্না যেখানে আনন্দের প্রতীক হওয়ার কথা, সেখানে অনেক পরিবারে সেটি স্বস্তির নিঃশ্বাস—“বেঁচে গেছে” বলেই কৃতজ্ঞ হতে হয়।
মা ও শিশুর নিরাপদ প্রসব কোনো অনুগ্রহ নয়; এটি মৌলিক অধিকার। চরাঞ্চলে ২৪ ঘণ্টা প্রসূতি সেবা, প্রশিক্ষিত ধাত্রী, আবাসিক চিকিৎসক, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং জরুরি রোগী পরিবহনের জন্য নৌ-অ্যাম্বুলেন্স বা ভ্রাম্যমাণ চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু এখন সময়ের দাবি।
চরবাসীর আহ্বান চিকিৎসা সেবা সকল নাগরিকের মৌলিক অধিকার, আমাদের অধিকার বঞ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়।
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.