
নিজস্ব প্রতিবেদক: পুরো ব্যবস্থাকে ‘দুমড়ে-মুচড়ে’ সবশেষ তিনটি সংসদ নির্বাচনে ‘কাগুজে রায়’ দেওয়া হয়েছিল বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
তিনি বলেছেন, “আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিছু কিছু জানতাম। কিন্তু এত নির্লজ্জভাবে পুরো প্রক্রিয়াকে বিকৃত করে, ব্যবহস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে নিজেদের মনের মতো একটা কাগুজে রায় লিখে দিয়েছে যে, এগুলো জাতির সামনে তুলে ধরা দরকার। পুরো রেকর্ড থাকা দরকার।”
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “দেশের টাকা খরচ করে, মানুষের টাকায় নির্বাচন করে পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে। এ দেশের মানুষ অসহায়ের মতো তাকিয়ে ছিল। কিছু করতে পারেনি।
“এ দেশের জনগণ যেন কিছুটা হলেও স্বস্তি পায়, সেজন্য যারা যারা জড়িত ছিল, তাদের চেহারাগুলো সামনে আনতে হবে। কারা করল, কীভাবে করল, সেটা জানতে হবে। নির্বাচন ডাকাতি আর কখনো যেন না ঘটতে পারে, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।”
তিন নির্বাচনের ‘দুর্নীতি, অনিয়ম ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড’ তদন্তে গঠিত ‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’ প্রতিবেদন জমা দিতে গেলে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন।
সোমবার বিকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন— যমুনায় গিয়ে এ প্রতিবেদন জমা দেয় কমিশন। পরে প্রধান উপদেষ্টার দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর কমিশনের সদস্যরা তদন্তের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন।
সেখানে কমিশনপ্রধান সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন, কমিশনের সদস্য শামীম আল মামুন, কাজী মাহফুজুল হক সুপণ, তাজরিয়ান আকরাম হোসেন ও মো. আব্দুল আলিম উপস্থিত ছিলেন।
অন্যদের মধ্যে আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী উপস্থিত ছিলেন।
তদন্ত প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এবং অবশিষ্ট ১৪৭টি আসনে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতার’ নামে যে নির্বাচন হয়, তা ছিল সাজানো ও সুপরিকল্পিত।
রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে এই বন্দোবস্ত করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।,
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালের নির্বাচন সারা বিশ্বে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন হিসেবে সমালোচিত হওয়ায় শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ২০১৮ সালের নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ হিসেবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা নেয়। বিএনপিসহ অন্যান্য বিরোধী দল এ সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার বিষয়টি অনুধাবন করতে না পেরে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে।
তদন্ত কমিশনের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রায় ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে রাতের বেলায় ব্যালট পেপারে সিল মেরে আওয়ামী লীগের বিজয় নিশ্চিত করা হয়। দলটিকে জেতাতে প্রশাসনের ভেতরে এক ধরনের অসৎ প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশের বেশি দেখানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি’ প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক’ দেখানোর অপকৌশল গ্রহণ করা হয়।
কমিশন বলেছে, তিনটি নির্বাচনের পরিকল্পনাই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী করা হয় এবং বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশকে রাষ্ট্রীয়ভাবে ব্যবহার করা হয়। এ উদ্দেশ্যে কিছু কর্মকর্তার সমন্বয়ে বিশেষ একটি সেল গঠন করা হয়, যা ‘নির্বাচন সেল’ নামে পরিচিতি পায়।
২০১৪ থেকে ২০২৪ সময়কালে নির্বাচন ব্যবস্থাকে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে ধীরে ধীরে প্রশাসনের হাতে নিয়ে যাওয়া হয় বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়। এ সময় কমিশনের পরিবর্তে প্রশাসনই নির্বাচন পরিচালনার প্রধান শক্তি হয়ে ওঠে।
তদন্ত প্রতিবেদনের সঙ্গে কমিশনের পক্ষ থেকে একটি সুপারিশমালাও জমা দেওয়া হয়েছে।,











