
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে শিকড় গেড়েছে ৫ হাজার কোটি টাকার এক বিশাল অবৈধ গাইড বই বাণিজ্য। প্রতি বছর বছরের শুরুতে কোটি কোটি শিক্ষার্থীর হাতে সময়মতো সরকারি পাঠ্যবই না পৌঁছানোর নেপথ্যে কাজ করছে এক শক্তিশালী ‘প্রকাশনা মাফিয়া’ ও অসাধু সরকারি কর্মকর্তাদের অশুভ আঁতাত। অভিযোগ উঠেছে, পাঠ্যবই ছাপাতে ইচ্ছাকৃত বিলম্ব ঘটিয়ে গাইড বইয়ের বাজার চাঙ্গা রাখাই এই সিন্ডিকেটের মূল লক্ষ্য।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) টানা ১৫ বছর ধরে বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের সব বই দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষের শুরুতেও মাধ্যমিকের ৬০ লক্ষাধিক শিক্ষার্থী অন্তত একটি বইও পায়নি। অথচ সরকারি বইয়ের হদিস না থাকলেও বাজারের লাইব্রেরিগুলো সয়লাব হয়ে আছে নিষিদ্ধ গাইড বইয়ে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বাজারের ৮০ শতাংশ নোট-গাইড নিয়ন্ত্রণ করছে লেকচার পাবলিকেশন। তারা অত্যন্ত সুকৌশলে নতুন বছরের পাঠ্যবইয়ের পাণ্ডুলিপি ‘ফাঁস’ করে ১ জানুয়ারির আগেই বাজারে গাইড সরবরাহ নিশ্চিত করেছে।
সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, এই অবৈধ ব্যবসার মেরুদণ্ড হিসেবে কাজ করছেন খোদ শিক্ষা ক্যাডারের পাঁচ শতাধিক কর্মকর্তা। তারা সরকারি চাকরিতে বহাল থেকে গোপনে মাসিক বেতনের বিনিময়ে লেকচার পাবলিকেশনের নোট ও গাইড বই লিখে দিচ্ছেন। এনসিটিবির এক শ্রেণির কর্মকর্তা এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। গত ১৫ ডিসেম্বরও এনসিটিবি ভবনে গাইড ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অসাধু কর্মকর্তাদের এক গোপন বৈঠকের খবর পাওয়া গেছে।
গাইড বইয়ের বিক্রি নিশ্চিত করতে এই প্রকাশনী সংস্থাটি রাজধানীসহ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ঘুষ ও কমিশন বাবদ বরাদ্দ রেখেছে। রাজধানীর নামী-দামী স্কুলগুলোর প্রতিটির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। স্কুলের শিক্ষকরা ক্লাসে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর ‘সহায়ক বই’ বা ‘অনুশীলনমূলক বই’ কেনার জন্য তালিকা ধরিয়ে দিচ্ছেন, যা মূলত উচ্চ আদালতের নিষিদ্ধ করা নোট-গাইডেরই নামান্তর।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অভিভাবক বলেন “স্কুল থেকে নির্দিষ্ট গাইডের নাম বলে দেওয়া হয়। আমাদের পক্ষে সেই আর্থিক চাপ সওয়া কঠিন, কিন্তু কিছু করার নেই।”
অভিযোগ রয়েছে, এনসিটিবির অসাধু কর্মকর্তাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে মুদ্রণের ‘র’ কপি (সিডি) এবং সিলেবাসের আগাম তথ্য সংগ্রহ করে লেকচার পাবলিকেশন। প্রতিষ্ঠানের সাবেক পরিচালক আজহারুল ইসলাম এই বিপুল পরিমাণ অর্থের হিসাব ও বিদেশে অর্থ পাচারের তথ্য জেনে যাওয়ায় তাকে মাত্র ৫ মিনিটের নোটিশে বের করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি তার পাসপোর্ট ও নথিপত্র আটকে রেখে তাকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষে বই পৌঁছাতে দেরির নেপথ্যে রয়েছে রহস্যময় ‘রিটেন্ডার’ প্রক্রিয়া। মাধ্যমিকের ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণির বইয়ের ক্ষেত্রে রিটেন্ডার দিয়ে ৩ মাস বিলম্ব করা হয়েছে। অন্যদিকে, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই নবম শ্রেণির কার্যাদেশ আড়াই মাস আটকে রাখা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বিলম্ব কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি নয়, বরং গাইড ব্যবসায়ীদের বাড়তি মুনাফার সুযোগ করে দেওয়ার এক পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, নোট-গাইড নির্ভরতা শিক্ষার্থীদের মেধা ও সৃজনশীলতাকে গলা টিপে হত্যা করছে। ভুলভ্রান্তিতে ভরা এসব বই মুখস্থ করার ফলে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে ঠেকছে।
২০০৮ সালে হাইকোর্ট নোট-গাইড নিষিদ্ধ করলেও সাত বছরের কারাদণ্ডের বিধান কাগজ-কলমেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। প্রশাসনের চোখের সামনেই চলছে এই ৫ হাজার কোটি টাকার অন্ধকার কারবার।,











