
নিজস্ব প্রতিবেদক: পবিত্র রমজান সামনে রেখে লাফিয়ে বেড়েছে মুরগির দাম। মুরগির তুলনায় দামের দিক থেকে লেবু ও শসা যেন উড়ছে। একই অবস্থা বেগুনের দামেও। এ ছাড়া পাল্লা দিয়ে বেড়েছে রমজানে ব্যবহার্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম। রোজা শুরু আগেই বাজারে উত্তাপ বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজান শুরু হলে দাম আরও বাড়তে পারে। এ যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে রমজান মাসের। গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর কয়েকটি কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, ছোট আকৃতির প্রতিহালি লেবু ১০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ইফতারের অন্যতম উপাদান শসা প্রতি কেজি বিক্রি হয় ১০০ টাকায়। অথচ গত সপ্তাহে বাজারে প্রতিহালি লেবু ২০ থেকে ৩০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। শসা বিক্রি হয়েছিল ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। এর ফলে পণ্য দুটি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে।
রমজানে চিনির বাড়তি চাহিদা থাকলেও এবার এর দাম বাড়েনি। ফলে এই একটি পণ্যে স্বস্তিতে ভোক্তারা। গতকাল কারওয়ানবাজারে প্রতি কেজি সাদা চিনি বিক্রি হয়ে ১০০ টাকায়। রমজান সামনে রেখে ডালের দাম আগেই বেড়েছিল। ১০ টাকা বাড়তি দামে গতকাল মোটা দানার মসুর ডাল বিক্রি হয় প্রতি কেজি ৯০ টাকায়। পেঁয়াজু তৈরিতে ব্যবহার্য খেসারি ডাল ১০ টাকা বেশি ৯০ টাকায় বিক্রি হয়। দেশি মসুর ডাল বিক্রি হয় ১৬০ থেকে ১৭০ টাকায়। প্রতি কেজি পাম তেলের দাম ছিল ১৫০ টাকা। মুগ ডাল বিক্রি হয় কেজিতে ১৫০ টাকা, বুটের ডাল ৯০ টাকা।
তবে রমজানের দুদিন আগে গতকাল কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে ছোলার দামে তেলেসমাতি দেখা যায়। সকালে কারওয়ানবাজারের কিচেন মার্কেটে ভালো মানের ছোলার দাম ছিল ৮০ টাকায়। দুপুর ১২টা পর্যন্ত এ দামেই বিক্রি হয়। এরপর হঠাৎ করেই দাম বেড়ে প্রথমে ৮৫, পরে ৯০ টাকায় উঠে যায়। যখন দাম বাড়ে, তখন এ প্রতিবেদক কিচেন মার্কেটেই অবস্থান করছিলেন। এত দ্রুত মার্কেটের সব দোকানি একই দামে ছোলার দাম বৃদ্ধি যেন একটা জাদুকরি ব্যাপার মনে হয়েছে।
নিম্ন আয়ের লোকদের ভরসা ব্রয়লার মুরগির দামের ঊর্ধ্বগতি লক্ষ করা গেছে। দুই দিনের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা বেড়ে গতকাল ২০০ থেকে ২১০ টাকায় বিক্রি হয় ব্রয়লার মুরগি। দাম বেড়েছে সোনালি মুরগিরও। ৩০ টাকা বেড়ে প্রতিকেজি সোনালি মুরগি বিক্রি হয় ৩৫০ টাকায়। ব্যবসায়ীরা বলেছেন দাম আরও বাড়বে। রমজানে অতি গুরুত্বপূর্ণ পেঁয়াজের দাম বেড়েছে। যেখানে দুই দিন আগেও বিক্রি হয়েছে ৪০ থেকে ৪৫ টাকায়। সেখানে গতকাল কেজিপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ টাকায়।
এ ছাড়া দাম বেড়েছে খেজুরের। ৪৫ থেকে ৫০ বা জাত ভেদে তার চেয়েও বেশি বেড়েছে। মরিয়ম খেজুর কেজিপ্রতি ১০০ টাকা বেড়ে ১০০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। তিউনিশিয়ার খেজুর ৫০ টাকা বেড়ে ৫৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ১০০ টাকা কেজি দরে, যা গত সপ্তাহে ৫০ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হয়। টমেটোতে কেজিপ্রতি ২০ টাকা বেড়ে ৬০ টাকায় ওঠে।
ডিমের দাম স্বাভাবিক থাকলেও দাম বেড়েছে মাছের বাজারে। গত কয়েক দিনে কেজিপ্রতি ৪০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে। রুই মাছ বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা কেজি দরে। তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ২২০ টাকা কেজি।
ফলের বাজারেও উত্তাপ ছড়াতে দেখা গেছে। প্রতি কেজি আপেল ৩৫০ টাকা, মাল্টা ৩৪০ টাকা এবং আঙ্গুর ৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। ব্যবসায়ীরা বলছেন নির্বাচনের কারণে অনেক মানুষ বাড়িতে থাকায় ক্রেতার সংখ্যা কিছুটা কম লক্ষ করছেন তারা। নিম্ন আয়ের মানুষ সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
কারওয়ানবাজারে আসা মনিরুল হক নামের এক ব্যক্তি বলেন, আমি ছোট একটা চাকরি করি। সংসার চালাতে হিমশিম খাই। আসছে রমজানে এভাবে যদি দাম বেড়েই চলে, তবে আমাদের না খেয়ে বা কম খেয়ে রোজা রাখতে হবে। তাই নতুন সরকারের কাছে দাবি করি, তারা যেন বাজার তদারকির মাধ্যমে জিনিসপত্রের দাম সহনীয় পর্যায়ে রাখে। নয়তো রমজানে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের বাজার করা দুরূহ হয়ে যাবে।
চট্টগ্রামে বাড়তি দামে মুরগি : একদিন পরই পবিত্র রমজান শুরু। এর আগ থেকেই চট্টগ্রামের বাজারে বাড়তে শুরু করেছে মুরগির দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কেজিপ্রতি ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে ব্রয়লার মুরগি গতকাল বিক্রি হয় ১৯০ থেকে ২১০ টাকায়। একই সঙ্গে সোনালি জাতের মুরগির দাম দাঁড়িয়েছে সর্বোচ্চ ৩৫০ টাকা কেজি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, রমজানকে ঘিরে চাহিদা বৃদ্ধির কারণেই এই দামের উল্লম্ফন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে কার্যকর তদারকির অভাবেই এমন অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে।
গতকাল চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, দুদিন আগেও ব্রয়লারের কেজি ছিল ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা। বর্তমানে তা বেড়ে কোথাও ২০০, কোথাও ২১০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ ছাড়া প্রতি কেজি সোনালি ৩৪০-৩৫০ টাকা, লেয়ার ৩৫০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
রমজান ঘিরে ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়ায় চাপে পড়েছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতারা। নগরীর মুরাদপুর এলাকার বেসরকারি চাকরিজীবী আশরাফ কবির বলেন, গরু-খাসির মাংস ও মাছও নাগালের বাইরে। তাই ব্রয়লার আর ডিমই ভরসা। কিন্তু রমজান এলেই হঠাৎ দাম বেড়ে যায়। গত বছরও রোজার আগে দাম ২৫০ টাকায় উঠেছিল। এবারও সেই আশঙ্কা দেখছি।
খামারিরা জানান, উৎপাদন পর্যায়েই অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। গত বছরের ডিসেম্বরে ব্রয়লার মুরগির একদিনের বাচ্চা বিক্রি হয়েছে ২২ থেকে ২৫ টাকায়। জানুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩০-৪০ টাকা। দুই সপ্তাহ আগেও বাচ্চার দাম ছিল ৪৫-৫০ টাকা। কিন্তু গত এক সপ্তাহে চার দফা বেড়ে এখন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের বাচ্চা খুচরা পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৮৫ টাকায়।
হাটহাজারীর ফতেপুর গ্রামের খামারি আকবর হোসেন বলেন, আমার দুটি খামারে তিন হাজার ব্রয়লার পালন করি। খাদ্য, বিদ্যুৎ, ভাড়া ও শ্রমিকের খরচ বেড়েই চলেছে। তার ওপর বাচ্চার দাম ৮০-৮৫ টাকা হলে খামার চালানো কঠিন। আর এমনিতে ঈদ বা রমজান সামনে এলেই উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বাচ্চার দাম বাড়িয়ে দেয় বলে দাবি করেন এই প্রান্তিক খামারি।
বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মো. সুমন হাওলাদার বলেন, উৎপাদন খরচ ও যুক্তিসঙ্গত মুনাফা হিসাব করলে ব্রয়লার বাচ্চার দাম ৩৫-৪০ টাকার বেশি হওয়ার সুযোগ নেই। অযৌক্তিক দাম নির্ধারণ করে প্রান্তিক খামারিদের ঝুঁকিতে ফেলা হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের নজরে আনা হলেও কার্যকর সমাধান মিলছে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রমজানকে ঘিরে কৃত্রিম সংকট তৈরি হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। এখনই বাজার মনিটরিং জোরদার এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে গত দুই বছরের মতো এবারও ব্রয়লার ও ডিমের বাজারে অস্থিরতা বিরাজ করার আশঙ্কা রয়েছে।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসেন বলেন, দাম বাড়ার কোনো মৌলিক কারণ নেই। বাজারে সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা ও তদারকির অভাবে ব্যবসায়ীরা ইচ্ছামতো দাম নির্ধারণ করছেন। ছোট খামারিরা লোকসানে পড়ে বাজার থেকে সরে যাওয়ায় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো প্রভাব বিস্তার করছে। এতে ভোক্তা ও প্রান্তিক খামারি উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।,











