নিজস্ব প্রতিবেদক: সজীব ওয়াজেদ জয় বলেছেন, মা হয়তো আর সক্রিয় রাজনীতিতে ফিরবেন না। কারণ, তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি এ কথা বলেন। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন। গত বুধবার প্রকাশিত ভিডিও কথোপকথনে জয় আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা এবং দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।
আলজাজিরার প্রশ্ন ছিল, ‘বাংলাদেশে কি আওয়ামী লীগের কোনো ভবিষ্যৎ আছে?’
জয় বলেন, ‘অবশ্যই আছে। আওয়ামী লীগ কোথাও যাচ্ছে না। এটি সবচেয়ে পুরোনো এবং বড় দল। আমাদের ভোটের হার ৪০-৫০ শতাংশ। আপনি কি মনে করেন, এই ৪০-৫০ শতাংশ মানুষ শুধু শুধু দলটিকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেবে? ১৭ কোটি মানুষের দেশে প্রায় ছয়-সাত কোটি ভোটার আওয়ামী লীগের সমর্থক। আপনি কি ভাবছেন, তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন করা বন্ধ করে দেবে?’
শ্রীনিবাসন– ‘আমি এটা জিজ্ঞেস করলাম, কারণ আপনি ইঙ্গিত দিয়েছেন, আপনার মা রাজনীতি থেকে অবসর নেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। তার মানে কি এই, তিনি যদি কখনও বাংলাদেশে ফিরে যেতে পারেনও, তবু তিনি আর রাজনৈতিক অঙ্গনে থাকবেন না?’
জয়– ‘না, তিনি বৃদ্ধ। মা এখন প্রবীণ। এমনিতেও এটিই ছিল তার শেষ মেয়াদ। তিনি অবসর নিতে চেয়েছিলেন।’
– ‘তাহলে কি এটি এক অর্থে হাসিনা যুগের অবসান?’
– ‘সম্ভবত, হ্যাঁ।’
– ‘ঠিক আছে। তার মানে আপনি বলছেন, আওয়ামী লীগ যদি আবারও বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়, তবে সেটি তাঁকে ছাড়াই হবে।’
– ‘হ্যাঁ। আওয়ামী লীগ একটি রাজনৈতিক দল। এটি ৭০ বছরের পুরোনো দল। তাঁকে ছাড়াই হোক বা তাঁকে সঙ্গে নিয়েই হোক– এই দল টিকে থাকবে। কেউই তো চিরকাল বেঁচে থাকে না।’
মৃত্যুর দায় ও অডিও ক্লিপ বিতর্ক
সজীব ওয়াজেদ দাবি করেছেন, বাংলাদেশে বর্তমানে একটি ‘প্রহসনের নির্বাচন’ চলছে। একই সঙ্গে তিনি ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শত শত মানুষের মৃত্যুর দায় অস্বীকার করে এর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু সদস্যের ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ’ এবং আন্দোলনকারীদের ভেতর থাকা ‘উগ্রপন্থিদের’ দায়ী করেছেন।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে প্রাণহানির বিষয়ে জয় বলেন, ‘আওয়ামী লীগ আন্দোলন মোকাবিলায় ভুল করেছে (মিসহ্যান্ডল)। কিন্তু মা কাউকে হত্যার নির্দেশ দেননি। তিনি যদি হত্যার নির্দেশ দিতেন, তবে আজও তিনি ক্ষমতায় থাকতেন।’
শ্রীনিবাসন জৈন আলজাজিরা ও বিবিসির সংগৃহীত অডিও ক্লিপের প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন। সেখানে শেখ হাসিনাকে মারণাস্ত্র ব্যবহারের নির্দেশ দিতে শোনা গেছে। জয় সেটিকে ‘আউট অব কন্টেক্সট’ বা খণ্ডিত অংশ বলে দাবি করেন। তাঁর ভাষ্য, শেখ হাসিনা কেবল সম্পদ রক্ষায় এবং জঙ্গিদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের কথা বলেছিলেন। তবে সাংবাদিক যখন জয়ের কাছে সেই পূর্ণাঙ্গ ভিডিওর প্রমাণ চান, জয় তা পরে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
নির্বাচনে নিষেধাজ্ঞা ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি
নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ না থাকাকে জয় ‘অবৈধ’ বলে অভিহিত করেন। সাংবাদিক তাঁকে মনে করিয়ে দেন, গত ১৫ বছর আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধেই নির্বাচন ব্যবস্থা ধ্বংসের অভিযোগ ছিল। জবাবে জয় বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কখনও কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেনি। জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল হয়েছিল আদালতের সিদ্ধান্তে।’ তিনি আরও দাবি করেন, ২০১৮ বা ২০২৪ সালের নির্বাচনে কারচুপির প্রয়োজন ছিল না। কারণ জরিপ অনুযায়ী আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তায় এগিয়ে ছিল।,
দুর্নীতির অভিযোগ ও এফবিআইয়ের তদন্ত
বিদেশে সম্পদ পাচার এবং পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রসঙ্গে জয় বলেন, ‘এফবিআই তদন্ত করে আমার কোনো অবৈধ সম্পদ পায়নি। আমি কেবল এই বাড়িটিরই (ওয়াশিংটন ডিসি) মালিক।’ যুক্তরাজ্যে আওয়ামী লীগের সাবেক এক মন্ত্রীর ৩৬০টি বাড়ির হদিস পাওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে জয় জানান, ওই মন্ত্রী বা অন্যদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের দায় তাঁর পরিবারের নয়।
ভারতের ওপর আস্থা
শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন। তাঁকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর চাপ বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে জয় বলেন, ‘ভারত আমার মায়ের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশ। ভারতের বিচার ব্যবস্থা ও আইনের শাসনের ওপর আমাদের পূর্ণ আস্থা আছে। সেখান থেকে তাঁকে ফেরত পাঠানো সম্ভব হবে না। কারণ তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।’
সাক্ষাৎকারের শেষে জয় বর্তমান সরকারের সমালোচনা করে বলেন, গত দেড় বছরে দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। তবে সাংবাদিক শ্রীনিবাসন জৈন পাল্টা যুক্তিতে বলেন, আওয়ামী লীগ কি বর্তমান সংকটের কারণ, নাকি এর সমাধান– তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে।,
সূত্রঃ আলজাজিরা
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.