নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সারের বাজারেও অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এতে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে সারের সরবরাহ ও দামের ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৬০ লাখ টন সারের চাহিদা রয়েছে। এসব সার আমদানি ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) এবং বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)। দেশীয় উৎপাদন সীমিত হওয়ায় ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি), ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) এবং মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সারের বড় অংশ বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
বাংলাদেশে সারের প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে সৌদি আরব, মরক্কো, চীন, রাশিয়া ও কানাডা। ডিএপি সারের ক্ষেত্রে সৌদি আরব বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার, যা দেশের মোট চাহিদার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সরবরাহ করে। টিএসপি ও ইউরিয়ার বড় উৎস মরক্কো ও চীন। পটাশ সরবরাহে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে রাশিয়া ও কানাডা।
গ্যাস সংকটের কারণে সরকারি নির্দেশে দেশের পাঁচটি ইউরিয়া সার কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। বিসিআইসির অধীনে পাঁচটি ইউরিয়া কারখানা এবং একটি করে ডিএপি ও টিএসপি কারখানা রয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রামে বেসরকারি কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেড ইউরিয়া উৎপাদন করে থাকে। এসব কারখানায় মূলত গ্যাস ব্যবহার করে ইউরিয়া উৎপাদন করা হয়।
বিসিআইসির একজন অতিরিক্ত প্রধান রসায়নবিদ তথ্য দেন যে কারখানাগুলোতে এলএনজি গ্যাস ব্যবহার করে প্রথমে অ্যামোনিয়া উৎপাদন করা হয় এবং পরবর্তীতে তা প্রক্রিয়াজাত করে ইউরিয়া সার তৈরি করা হয়। ব্যবহৃত এলএনজির বড় অংশ মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গ্যাস সরবরাহ শৃঙ্খলে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখার যুগ্ম সচিব মো. খোরশেদ আলম তথ্য দেন যে বর্তমানে দেশে প্রায় ১৬ লাখ ৮৪ হাজার টন সার মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে ৪ লাখ ৮১ হাজার টন ইউরিয়া, ৩ লাখ ৮৩ হাজার টন টিএসপি, ৪ লাখ ৭১ হাজার টন ডিএপি এবং ৩ লাখ ৪৯ হাজার টন এমওপি রয়েছে। এ মজুদ দিয়ে আগামী মে থেকে জুন পর্যন্ত পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব।
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান সিআরইউ গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী সাম্প্রতিক সংঘাতের পর ইউরিয়া সারের বৈশ্বিক মূল্য ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত সপ্তাহে টনপ্রতি ইউরিয়ার দাম ৪৮৪ থেকে ৪৯০ ডলার থাকলেও বর্তমানে তা ৬২৫ ডলারে পৌঁছেছে। মার্চের শুরুতে বৈশ্বিক বাজারে সব ধরনের সারের দাম গড়ে ১২ শতাংশের বেশি বেড়েছে।
আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বে সার উৎপাদনের কাঁচামালের প্রায় এক-চতুর্থাংশ থেকে এক-তৃতীয়াংশ পরিবহন করা হয়। একই পথ দিয়ে সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ চলাচল করে। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এ রুটে পরিবহন বিঘ্নিত হলে অ্যামোনিয়া ও নাইট্রোজেন পরিবহনেও প্রভাব পড়তে পারে।
ওয়ার্ল্ড ইন্টিগ্রেটেড ট্রেড সলিউশন তথ্য দেয় যে রাশিয়া, মিসর ও সৌদি আরবের পর ইরান ইউরিয়া সারের চতুর্থ বৃহৎ রফতানিকারক দেশ। ইউরিয়া উৎপাদনের প্রধান কাঁচামাল গ্যাসের বড় রফতানিকারক দেশ কাতার। কাতারের রাশ লাফান সিটিতে গ্যাস অবকাঠামোয় ড্রোন হামলার পর ওই অঞ্চলের বড় গ্যাস স্থাপনাগুলো বন্ধ রয়েছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম তথ্য দেন যে আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দামে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে এবং যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে দাম আরও বাড়তে পারে। চলমান বোরো মৌসুমে কিছু এলাকায় কৃষকেরা সারের সরবরাহে সমস্যার মুখে পড়ছেন এবং বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল ই মোহামেদ তথ্য দেন যে বর্তমানে দেশে সারের কোনো সংকট নেই এবং চলমান বোরো মৌসুমে মজুদ সার দিয়ে চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে ভবিষ্যৎ মৌসুমে যাতে কোনো সমস্যা না হয় সে জন্য আগাম প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী দেশের মোট সারের চাহিদার বড় অংশ রবি ও বোরো মৌসুমে ব্যবহৃত হয়। শীতকালীন সবজি ও বোরো ধানের মৌসুমে প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ লাখ টন সার ব্যবহৃত হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় সরবরাহ শৃঙ্খল স্বাভাবিক রাখা এবং প্রয়োজন হলে বিকল্প উৎস থেকে আমদানির প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.