
নিজস্ব প্রতিবেদক: মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে অল্প সময়ের মধ্যেই আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও গ্যাস রফতানি কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জ্বালানি বাজার বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে ইরানের ড্রোন হামলায় কাতারের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস স্থাপনা রাস লাফান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় দেশটি জরুরি পরিস্থিতি ঘোষণা করেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন দেখা দিয়েছে।
হামলার পর সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান সৌদি আরামকো তাদের রাস তানুরা রিফাইনারির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করেছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাত আরও দীর্ঘায়িত হলে উপসাগরীয় অঞ্চলের অন্যান্য জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলোও একই ধরনের সংকটে পড়তে পারে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে এবং বিশ্ব অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তার তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে উপসাগরীয় অঞ্চলের জ্বালানি রফতানিকারক দেশগুলো নিরাপত্তাজনিত কারণে ফোর্স মাজর ঘোষণা করে জ্বালানি সরবরাহ চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করতে বাধ্য হতে পারে।
বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম এলএনজি উৎপাদক কাতার ইতোমধ্যে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েছে। ইরানের ড্রোন হামলায় দেশটির বৃহত্তম এলএনজি স্থাপনা রাস লাফান গ্যাস প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি চলতি সপ্তাহে ফোর্স মাজর ঘোষণা করেছে। এর ফলে কাতারের গ্যাস সরবরাহে উল্লেখযোগ্য বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
সাদ আল-কাবি আরও জানান, যুদ্ধ এখনই থেমে গেলেও স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ফিরতে কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। হামলার ফলে অবকাঠামোর ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি এবং স্থাপনাগুলো মেরামতে সময় প্রয়োজন।
সংঘাতের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। শুক্রবার ইউরোপীয় বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি প্রায় ৮৭ দশমিক ৬ ডলারে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে সর্বোচ্চ। সাদ আল-কাবি তথ্য দেন, যদি হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, তবে আগামী দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। তবে চলমান সংঘাতের প্রভাবে এ জলপথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে ব্যাহত হয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তত ১০টি বাণিজ্যিক জাহাজ হামলার শিকার হয়েছে এবং বীমা প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়ায় অনেক জাহাজ মালিক এ পথ ব্যবহার করতে অনিচ্ছুক হয়ে পড়েছেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল সচল রাখতে মার্কিন নৌবাহিনীর নিরাপত্তা সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং শিপিং কোম্পানিগুলোর জন্য অতিরিক্ত বীমা সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, উপসাগরীয় অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে শুধু জ্বালানি বাজারই নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও শিল্প উৎপাদনেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। কারণ এ অঞ্চল বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ পেট্রোকেমিক্যাল ও সার উৎপাদনের কাঁচামাল সরবরাহ করে।
এদিকে কাতার তাদের নর্থ ফিল্ড গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলারের একটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৭ সালের মধ্যে দেশটির বার্ষিক এলএনজি উৎপাদন ৭৭ মিলিয়ন টন থেকে বাড়িয়ে ১২৬ মিলিয়ন টনে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে। তবে চলমান সংঘাতের কারণে এই প্রকল্প বাস্তবায়নেও বিলম্বের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন কাতারের জ্বালানিমন্ত্রী সাদ আল-কাবি।










