
নিজস্ব প্রতিবেদক: কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে বিস্ফোরণে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া মাদ্রাসা থেকে দুটি তৈরি বোমা, পাঁচটি ইলেকট্রিক বোমা সদৃশ বস্তুসহ বোমা তৈরির প্রচুর উপকরণ উদ্ধার হওয়ার তথ্য দিয়েছে পুলিশ।
মামলার বিষয়ে প্রাথমিক তদন্তের ভিত্তিতে রোববার আদালতে পুলিশ বলেছে, বিস্ফোরণের আগের ‘রাতজুড়ে বসে বসে বোমা বানিয়েছেন মাদ্রাসাটির পরিচালক শেখ আল আমিন’।
এ ঘটনায় শনিবার মধ্যরাতে দায়ের করা মামলায় বোমাসহ বোমা তৈরির নানা বস্তু উদ্ধার দেখিয়েছে পুলিশ। মামলায় আসামি করা হয়েছে সাতজনকে। তাদের মধ্যে ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রধান সন্দেহভাজন শেখ আল আমিনকে এখনো ধরা যায়নি।
রোববার আদালতে আসামিদের রিমান্ড শুনানিতে মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন এরা ‘জঙ্গি’। তবে ঢাকা জেলা পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি নিয়ে কিছু বলেনি। এ বিষয়ক প্রশ্ন এড়িয়ে গেছেন ঢাকার পুলিশ সুপার (এসপি) মিজানুর রহমান।
দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদে শুক্রবার সকাল ১০টার পর উম্মাল কুরা ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি মাদ্রাসায় ভয়াবহ বিস্ফোরণে কেঁপে ওঠে আশপাশের বাড়িঘর। প্রাথমিক ধাক্কা সামলে আশপাশের বাসিন্দারা দেখতে পান তিনটি শিশু ও স্ত্রীকে নিয়ে মাদ্রাসার পরিচালক ‘হাসপাতালের’ দিকে যাচ্ছেন। পরে দেখা যায়, হাসপাতালে আহত স্ত্রী ও সন্তানকে রেখে পালিয়ে যান আল আমিন।
এ ঘটনায় শনিবার বিকালে পুলিশ আল আমিনের স্ত্রী আছিয়া বেগমসহ তিন নারীকে গ্রেপ্তারের তথ্য দেয়। গ্রেপ্তার অন্য দুজন হলেন আছিয়ার ভাই হারুনুর রশীদের স্ত্রী ইয়াসমিন আক্তার (৩০) ও আসমানী খাতুন ওরফে আসমা (৩৪)।
এই তিনজনের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাতে ঢাকা ও বাগেরহাট থেকে আরও তিনজনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় পুলিশ।
এ তিনজন হলেন- শাহীন ওরফে আবু বকর ওরফে মুসা ওরফে ডিবা সুলতান (৩২), আমিনুর ওরফে দর্জি আমিন (৫০) ও শাফিয়ার রহমান ফকির (৩৬)।
আল আমিনসহ গ্রেপ্তার হওয়া ছয়জনের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে শনিবার মধ্যরাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি মামলা করেছে।
এতে উদ্ধার করা বস্তুর তালিকায় – ৩৯৪ লিটার তরল রাসায়নিক, ২৭ কেজি পাউডার জাতীয় পদার্থ, ৫০০ গ্রাম লোহার বল ও তারকাটা, দুটি শটগানের কার্তুজ, দুটি বোমা, পাঁচটি ইলেকট্রিক বোমা সদৃশ বস্তু, একটি টাকা গণনার মেশিন, এক জোড়া হ্যান্ডকাফ, ১৭টি বিভিন্ন ধরনের ইসলামী জিহাদী বইসহ কম্পিউটার, মোটরসাইকেল ও বিভিন্ন ধরসের বস্তুর কথা তুলে ধরা হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের করা মামলাটিতে আসামিদের বিরুদ্ধে জনমনে ত্রাস সৃষ্টিসহ দেশের জনগণ, জানমাল ও সম্পত্তির ক্ষতিসাধন, ধর্মীয় উগ্রবাদ ছড়ানো, নাশকতা সৃষ্টির চেষ্টা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
ঢাকার পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া তিন নারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তিনজনকে ঢাকা ও বাগেরহাট থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। কেরানীগঞ্জের এই বাসায় তাদের যাতায়াত ছিল।
শাহীন ওরফে আবু বকরের কাছ থেকে কিছু বিস্ফোরক দ্রব্য উদ্ধার হয়েছে। আর আমিন ও শাফিয়ার রহমানের মোবাইল থেকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার হয়েছে, যোগ করেন তিনি।
তবে তারা কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত কি না সেই প্রশ্নের জবাব দেননি এসপি।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ফতুল্লা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে দায়ের হওয়া একটি মামলায় এই আল আমিনকে আসামি করা হয়। তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল ‘নব্য জেএমবি’ নামে একটি উগ্রবাদী সংগঠনের সদস্য সন্দেহে।
পলাতক ‘জঙ্গি’ আল আমিন কয়েকজন পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুম কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেছেন। সেখানে তিনি তার পূর্বতন অপরাধের বিষয়গুলো উল্লেখ করেননি বলে তথ্য পাওয়ার দাবি করেছেন ওই কর্মকর্তা।
সারারাত বোমা তৈরি
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার এসআই জহিরুল ইসলাম রোববার ঢাকার অ্যাডিশনাল চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে আসামিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের আবেদন করেন।
রিমান্ড শুনানিতে তদন্ত কর্মকর্তা আদালতকে বলেন, এ মামলার প্রধান আসামি আল আমিন ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার সারারাত বোমা তৈরি করে। ফজরের নামাজ পড়ে ঘুমায়। পরদিন সকাল সাড়ে ১০টায় বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে ভবনটা তছনছ হয়ে যায়। আছিয়া আল-আমিনের স্ত্রী। আর আছিয়ার ভাবি আসমা।,
“অপর আসামি আসমানী এক সময় জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। সাত মাস আগে জঙ্গি মামলায় জামিন পান। শাহিনের বিরুদ্ধে চারটা মামলা হয় জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে। অপর আসামিরা তাদের সহযোগী।”
আসামি আসমানীর পক্ষে তার আইনজীবী গাউছুর রহমান সিরাজী রিমান্ড বাতিল চেয়ে জামিন আবেদন করেন। বলেন, “তার (মক্কেল শাহিন) বিরুদ্ধে আগে চারটা মামলা হয়। তবে জঙ্গি কার্যক্রমে সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় দুই মামলায় ইতিমধ্যে খালাস পেয়েছেন । তিনি একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার মত কোনো উপাদান নেই। তিনি কোনো নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্পৃক্ত নন। সম্পৃক্ত থাকলে দুই মামলায় খালাস পেতেন না। তার অপরাধ শুধু পূর্বের মামলা। তার রিমান্ড বাতিল করে প্রয়োজনে কারাফটকে জিজ্ঞাসা করার প্রার্থনা করছি।”
অপর আসামিদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। আদালতে অনুমতি নিয়ে কথা বলতে চান আছিয়া।
বিচারক অনুমতি দিলে প্রধান সন্দেহভাজন আল আমিনের স্ত্রী আছিয়া বলেন, “এ ঘটনার সাথে আমার ভাই-ভাবি, আত্মীয় কেউ কোনোভাবে জড়িত না। আমার স্বামী আল আমিন দ্বিতীয়বার জেলে গেলে আমার ভাই আমাকে মাদ্রাসাটা করে দেয়, যেন আমি টিকে থাকতে পারি। আল আমিন ২০২২ সালের শেষের দিকে জেল থেকে বের হয়ে এসে বলে, সে ভালো হয়ে গেছে। ফোনও চালাত না। এক/দেড় বছর ভালো ছিল।
“আল আমিনের বিষয়ে অনেক কিছু জানতাম না। জানলে আগেই (পুলিশকে) জানিয়ে রাখতাম। কারণ সে কিছু করলে আমরাই ফেঁসে যাব এই ভয়ে। সে আমাকে অনেক নির্যাতন করতো। ফোন চেক করলে বুঝতে পারবেন। সে অপরাধ করতে পারে। আমরা তো অপরাধ করিনি।”
আছিয়ার ভাই হারুনুর রশীদ ২০২২ সালে মাদ্রাসা করার কথা বলে একতলা ওই বাড়ি ভাড়া নেন। তিনি এখন দেশে নেই বলে পুলিশ তথ্য দিয়েছে। পরে মাদ্রাসাটি পরিচালনার দায়িত্ব পান আল আমিন।
কেরানীগঞ্জে চার কক্ষের বাড়িটির দুটো কক্ষে মাদ্রাসার পাঠদান চলত, একটি কক্ষে পরিবার নিয়ে থাকতেন আল আমিন। আরেকটি কক্ষ বসার ঘর বা অফিস কক্ষ হিসেবে ব্যবহার করা হত।
শুক্রবারের বিস্ফোরণে চার কক্ষের দুটো পুরোপুরি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ওই দুটো ঘরের শুধু ছাদটুকু অক্ষত আছে আর পাশের দেয়াল ধসে পড়েছে। অন্য দুটো কক্ষেও ভেঙে গেছে জানালার কাঁচ, জিনিসপত্র। এতে আহত হয়েছেন আছিয়া ও তার দুটি শিশু সন্তান।,











