নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রেমের টানে মেহেরপুরে বিয়ে করতে এসে পরিচয় গোপন করে পালিয়েছে দুই চীনা নাগরিক। এ ঘটনায় চীনে বাংলাদেশি নারী পাচার ও অবৈধ বিয়ে নিয়ে চলমান উদ্বেগ নতুন করে সামনে এসেছে।
শুক্রবার (৩০ জানুয়ারি) বেলা ১১টার দিকে দুইজন চীনা নাগরিক মেহেরপুর সদরের আমদহ ইউনিয়নের টেংরামারি গ্রামে আসেন। তারা স্থানীয় মৃত লিটনের কন্যা মরিয়ম খাতুনের (১৬) সঙ্গে ফেসবুকে প্রেমের সম্পর্কের সূত্র ধরে এলাকায় আসেন বলে জানা যায়। মেয়েটি লেখাপড়া করে না বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ঘটনাটি জানাজানি হলে স্থানীয় জনগণ ও মেয়ের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। এ সময় স্থানীয় এক ব্যক্তি ৯৯৯-এ কল দিলে সাহেবপুর ক্যাম্পের পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
পুলিশ চীনা নাগরিকদের সঙ্গে মেয়ের পরিবারের আলোচনার আয়োজন করে ও পারিবারিক সম্মতির ভিত্তিতে বিয়ে সম্পন্ন করার বিষয়ে প্রস্তাব দেয়। তবে চীনা নাগরিকেরা সে প্রস্তাবে সম্মতি না দিয়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন।
পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কাউকে আটক করেনি, এমনকি চীনা নাগরিকদের পরিচয়ও সংরক্ষণ করেনি সাহেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা। অন্যদিকে চীনা নাগরিকেরা পরিচয় গোপন করে রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনে চাকমা নাম দিয়ে টিকিট করে এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে।
মেহেরপুর সদর থানার সাহেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির উপপরিদর্শক (এসআই) শফিক বলেন, ‘টেংরামারি গ্রামের স্থানীয় একজন ৯৯৯-এ ফোন দেন। এরপর আমি সেখানে গিয়ে দেখি দুজন চীনা নাগরিক এসেছেন। পরে তাদেরকে বুঝিয়ে দুপুর দুইটার রয়েল এক্সপ্রেস পরিবহনে করে ঢাকা পাঠিয়ে দিই। তাদেরকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এসে বিবাহ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।’
এ ঘটনাটি এমন এক সময় সামনে এলো, যখন চীনে বাংলাদেশি নারী পাচার নিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে উদ্বেগজনক তথ্য প্রকাশ পাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর তথ্যমতে, কিছু সংঘবদ্ধ পাচারকারী চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে বাংলাদেশি নারীদের উচ্চ বেতনের চাকরি বা বৈধ বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। পরে জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে তাদের চীনে পাঠানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
মেহেরপুরের প্রবীণ সাংবাদিক ও জেলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি তোজাম্মেল আজম বলেন, ‘আমরা প্রায়ই বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেখি প্রেমের টানে কোনো বিদেশি নাগরিক অমুক দেশ থেকে অমুক গ্রামে এসেছেন। এ ধরনের ভিডিও প্রায়শই প্রকাশিত হয় এবং দ্রুত ভাইরালও হয়। কিন্তু একইভাবে প্রেমের টানে বাংলাদেশি নারীদের বিদেশে নিয়ে যাওয়ার পর তাদের পরিণতি কী হয়, সে বিষয়ে কোনো ফলো-আপ বা অনুসন্ধানী প্রতিবেদন আমরা খুব কমই দেখতে পাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রবণতা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে। অনেকেই ভাইরাল হওয়ার আশায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তুলছেন, পরে বিয়ে করে সেটিও অনলাইনে ভাইরাল করছেন। কিন্তু এর পর কী ঘটে, সেই বাস্তবতা আর কখনো সামনে আসে না।’
র্যাব ও পুলিশের সাম্প্রতিক অভিযানে এ ধরনের পাচারচক্রের একাধিক সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে বলে জানা গেছে। তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চীনে পৌঁছানোর পর অনেক নারী শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের ঝুঁকিতে পড়েন। এ বিষয়ে চীনা দূতাবাস ও বাংলাদেশ সরকার উভয়ই অবৈধ বিয়ে ও মানব পাচার নিয়ে একাধিকবার সতর্কতা জারি করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সাধারণ নাগরিকদের যেকোনো বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ে বা বিদেশে যাওয়ার প্রস্তাবের ক্ষেত্রে আইন যাচাই ও সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি, সন্দেহজনক প্রস্তাব বা কর্মকাণ্ড নজরে এলে নিকটস্থ থানায় জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.