
নিজস্ব প্রতিবেদক: নতুন সরকার গঠনের পরও দেশের শেয়ারবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরেনি। টানা দরপতন ও তারল্য সংকটের মধ্যে রোববার একদিনেই প্রধান শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ডিএসইএক্স সূচক ২২৩ পয়েন্ট বা ৪ দশমিক ৪২ শতাংশ কমে আবার পাঁচ হাজার পয়েন্টে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে বাজারে লেনদেনও কমেছে।
বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শেয়ারবাজারে আস্থার সংকট বিরাজ করছে। সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের পর সূচক ও লেনদেনে কিছুটা উত্থান দেখা গেলেও তা স্থায়ী হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, যার প্রভাব বাজারে দরপতনের মাধ্যমে প্রতিফলিত হচ্ছে।
পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ফারুক আহমেদ সিদ্দিকী জানান, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং এর ফলে বাজারে প্যানিক সেলের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তার মতে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কিছু প্রভাব পড়া স্বাভাবিক হলেও বাংলাদেশের বাজারে যে মাত্রায় পতন হচ্ছে তা অস্বাভাবিক। তিনি আরও বলেন, অনেক বিনিয়োগকারীর মধ্যে ফাইন্যান্সিয়াল লিটারেসির ঘাটতি রয়েছে, যা বাজারে অস্থিতিশীলতা বাড়ায়।
তিনি উল্লেখ করেন, দেশের শেয়ারবাজারে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যা রয়েছে। মৌলভিত্তিসম্পন্ন ভালো কোম্পানির সংখ্যা সীমিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর তুলনায় ট্রেডারের সংখ্যা বেশি। এদের একটি বড় অংশের আর্থিক জ্ঞান সীমিত হওয়ায় বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়।
তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে বাজারে সূচক ও লেনদেনে গতি দেখা যায়। এ সময় ডিএসইএক্স সূচক পাঁচ হাজার ১৫৪ পয়েন্ট থেকে বেড়ে প্রায় পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টে পৌঁছায় এবং লেনদেন হাজার কোটি টাকার বেশি হয়। তবে পরবর্তী সময়ে বাজারে ধারাবাহিক পতন শুরু হয়। মাত্র ছয় কার্যদিবসে সূচক প্রায় ৬০০ পয়েন্ট কমে আবার পাঁচ হাজার পয়েন্টের ঘরে নেমে এসেছে। একই সময়ে লেনদেনও কমে প্রায় ৫০০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে।
বাংলাদেশ পুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি কাজী নজরুল ইসলাম জানান, সাম্প্রতিক দরপতনের কারণে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ বেড়েছে। তার মতে, সাম্প্রতিক পতনের মাত্রা অনেক বেশি এবং এটি বাজারে বিনিয়োগকারীদের আস্থার সংকটের প্রতিফলন।
অন্যদিকে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের চেয়ারম্যান খন্দকার রাশেদ মাকসুদ এক সেমিনারে জানান, দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকারিতা বাজারের সূচকের ওঠানামার সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হয়, তবে সূচকের ওঠানামার সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থার সরাসরি সম্পর্ক নেই। তিনি জানান, গত দেড় বছরে পুঁজিবাজারে কাঠামোগত সংস্কার, কারসাজি প্রতিরোধে জরিমানা এবং বিভিন্ন নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
ভালো কোম্পানির ঘাটতির বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে কমিশন পাবলিক ইন্টারেস্ট এনটিটি আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। আইনটি কার্যকর হলে পুঁজিবাজারে মানসম্পন্ন কোম্পানির তালিকাভুক্তি বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
বাজারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, গত দুই বছরে পুঁজিবাজারে নতুন কোনো কোম্পানি তালিকাভুক্ত হয়নি। অপরদিকে তালিকাভুক্ত প্রায় ৩০ শতাংশ কোম্পানি জেড ক্যাটাগরিতে রয়েছে। ফলে বিনিয়োগযোগ্য শেয়ারের সংখ্যা সীমিত হয়ে পড়েছে।
এ ছাড়া মার্জিন ঋণের কারণে নেগেটিভ ইকুইটির চাপেও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আর্থিক সংকটে রয়েছেন। সাধারণ বিনিয়োগকারীদেরও বড় ধরনের লোকসান হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, বাজারে নতুন কোম্পানি তালিকাভুক্তি ও নতুন বিনিয়োগকারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো না গেলে বর্তমান সংকট থেকে দ্রুত উত্তরণ কঠিন হতে পারে।











