অনলাইন ডেস্ক: নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের ব্যাপক সমর্থনে রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ ঝাপা-৫ আসনে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলিকে বড় ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, নতুন এই দলটি সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় আসনের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে।
চূড়ান্ত ভোট গণনায় বালেন্দ্র শাহ পেয়েছেন ৬৮ হাজার ৩৪৮ ভোট। তার প্রতিদ্বন্দ্বী কেপি শর্মা ওলি পেয়েছেন ১৮ হাজার ৭৩৪ ভোট। প্রায় অর্ধলাখ ভোটের ব্যবধানে এই জয়কে নেপালের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে দুর্নীতি ও অপশাসনের বিরুদ্ধে তরুণদের নেতৃত্বে সংঘটিত আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত এটি নেপালের প্রথম সাধারণ নির্বাচন। সেই আন্দোলনে ৭৭ জন নিহত হন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ওই আন্দোলনের প্রভাব এবারের নির্বাচনে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে এবং তরুণ ভোটারদের বড় অংশ আরএসপির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
নেপালের নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিনিধি সভার ১৬৫টি সরাসরি আসনের মধ্যে রাত ৯টা পর্যন্ত আরএসপি ৪৪টি আসনে জয় নিশ্চিত করেছে এবং আরও ৭৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে দলটি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের সম্ভাবনার কাছাকাছি পৌঁছাবে। গত ২৭ বছরে নেপালের রাজনীতিতে কোনো দল এককভাবে সরকার গঠন করতে পারেনি।
প্রকাশিত ফলাফলে নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে এবং কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল ইউনিফাইড মার্কসিস্ট লেনিনিস্ট তৃতীয় স্থানে রয়েছে। চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ হতে আরও অন্তত দুই দিন সময় লাগতে পারে। পাহাড়ি দেশ হওয়ায় অনেক দুর্গম এলাকা থেকে ব্যালট সংগ্রহে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয় এবং এ কারণে ভোট গণনা তুলনামূলক ধীরগতিতে সম্পন্ন হয়।
নেপালের নির্বাচনী ব্যবস্থায় ফেডারেল সংসদের ৬০ শতাংশ সদস্য সরাসরি ভোট পদ্ধতিতে এবং ৪০ শতাংশ সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন। সরাসরি ভোট পদ্ধতিতে রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রতিনিধি সভার ১৬৫টি আসন সরাসরি ভোটে এবং ১১০টি আসন সমানুপাতিক প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে পূরণ করা হয়।
নেপালের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সিডি ভট্টের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলো রাজনীতি ও অর্থনীতিতে প্রভাব বজায় রেখেছিল এবং একই নেতাদের পুনরাবৃত্তি ক্ষমতায় দেখা গেছে। এবারের নির্বাচনে পরিবর্তনের পক্ষে থাকা শক্তি এবং বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামো বজায় রাখতে আগ্রহী শক্তির মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে।
নির্বাচনে নেপালি কংগ্রেস বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। গত সংসদের বৃহত্তম দলটি এখন পর্যন্ত মাত্র ছয়টি আসনে জয় পেয়েছে। দলটির শীর্ষ নেতা গগন থাপা নিজ আসনে পিছিয়ে রয়েছেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দহল প্রচণ্ড রুকুম পূর্ব-১ আসন থেকে জয়ী হলেও তার দল নেপালি কমিউনিস্ট পার্টি সারা দেশে মাত্র দুটি আসনে জয় পেয়েছে।
ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের প্রভাব ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রথমবারের মতো প্রায় আট লাখ তরুণ ভোটার অংশ নিয়েছেন এবং তাদের একটি বড় অংশ ৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহর নেতৃত্বাধীন আরএসপির পক্ষে ভোট দিয়েছেন।
আরএসপির মুখপাত্র মনিশ ঝা জানিয়েছেন, দলটির প্রধান লক্ষ্য দুর্নীতি, দারিদ্র্য ও কুশাসনের বিরুদ্ধে কাজ করা এবং দেশের প্রশাসন ও অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক লোকরাজ বারাল জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অসন্তোষ এবং সেবা প্রদানে পূর্ববর্তী সরকারগুলোর সীমাবদ্ধতা নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রতি জনগণের সমর্থন বাড়িয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, নতুন নেতৃত্বকে টেকসই ফলাফল দেখাতে না পারলে এই সমর্থন দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হতে পারে।
বালেন্দ্র শাহ নেপালে বালেন নামে পরিচিত। সামাজিক সমস্যা ও রাজনৈতিক দুর্নীতির সমালোচনামূলক সংগীতের মাধ্যমে তিনি তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। ২০২২ সালে তিনি কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন এবং মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ট্র্যাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন, সরকারি জমির অবৈধ দখল উচ্ছেদ এবং দীর্ঘদিনের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সংকট সমাধানে পদক্ষেপ নেন।
নির্বাচনী প্রচারণায় আরএসপি ডিজিটাল আধুনিকায়ন, সুশাসন এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেয়। দলটির ইশতেহারে পাঁচ বছরে প্রায় ১২ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টির পরিকল্পনা এবং মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৪৪৭ ডলার থেকে ৩ হাজার ডলারে উন্নীত করার লক্ষ্য উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া স্বাস্থ্যসেবায় বীমা চালুর কথাও বলা হয়েছে।
ইপেপার
Copyright © 2026 ThikanaTV.Press. All rights reserved.