গুমের শিকার ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের, ২২ শতাংশ বিএনপির

নিজস্ব প্রতিবেদক: ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বলপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল বলে জানিয়েছে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন। কমিশন বলেছে, প্রাপ্ত উপাত্তে প্রমাণিত, এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অপরাধ। এসব ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সরাসরি সম্পৃক্ত বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। অনেক গুমের সরাসরি নির্দেশদাতা শেখ হাসিনা।

সাড়ে ১৫ বছরে দেশে প্রায় ৬ হাজার ব্যক্তি গুম হয়েছেন। এর মধ্যে ১ হাজার ৫৬৯ জনকে ইতোমধ্যে চিহ্নিত করেছে গুম কমিশন। এছাড়া কমিশন তদন্তকালে নিশ্চিত হয়েছে গুম হওয়ার পর মারা গেছেন ২৮৭ জন।

এদিকে গুম হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রাজনৈতিক পরিচয় মিলেছে ৬১ শতাংশের। এ তালিকার হাই প্রোফাইলদের গুম করা হয় তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার সরাসরি নির্দেশে। যাদের অনেককে আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই সীমান্ত পার করে ভারতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। গুম সংক্রান্ত ‘কমিশন অব ইনকোয়ারি’র চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গুমের শিকার ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী। ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের। তবে এখনো যারা নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের।

প্রতিবেদনটি প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে রোববার জমা দিয়েছে কমিশন। এর আগেও তিন দফায় আংশিকভাবে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রতিবেদন জমাকালে উপস্থিত ছিলেন কমিশনের সভাপতি বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী, কমিশনের সদস্য-বিচারপতি মো. ফরিদ আহমেদ শিবলী, নূর খান লিটন, নাবিলা ইদ্রিস ও সাজ্জাদ হোসেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, হাই প্রোফাইল গুমের ঘটনায় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন। এ তালিকায় থাকা অন্যতম ব্যক্তি হলেন-বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী, হুম্মাম কাদের চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমদ, চৌধুরী আলম, জামায়াত নেতা ও সাবেক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আবদুল্লাহিল আমান আযমী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামান। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অনেক গুমের ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা নিজে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন। তাছাড়া গুমের শিকার ব্যক্তিদের ভারতে রেন্ডিশনের (আইনি প্রক্রিয়া ছাড়াই গোপনে হস্তান্তর) যে তথ্য পাওয়া গেছে এতে স্পষ্ট হয়, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশেই এগুলো হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী র‌্যাব, পুলিশ, ডিবি এবং বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাই গুমে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে। অনেক ঘটনায় একাধিক বাহিনীর যৌথ সম্পৃক্ততাও পাওয়া গেছে।

প্রতিবেদনে কমিশন জানায়, রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া ৯৪৮ জনের মধ্যে ৪৭৬ জন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী। ২৩৬ জন ছাত্রশিবিরের, ১৪২ জন বিএনপির, ৪৬ জন ছাত্রদলের এবং ১৭ জন যুবদলের নেতাকর্মী। এ হিসাবে গুমের শিকার ব্যক্তিদের মধ্যে যারা জীবিত ফিরেছেন, তাদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী, ২২ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী। যারা এখনো নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের মধ্যে ৬৮ শতাংশ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং ২২ শতাংশ জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মী।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, কমিশন গঠনের পর গুমের শিকার পরিবারের কাছ থেকে অভিযোগ জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। এতে ১ হাজার ৯১৩টি অভিযোগ গুম তদন্ত কমিশনে জমা পড়েছে। এর মধ্যে যাচাই-বাছাই শেষে ১ হাজার ৫৬৯টি অভিযোগ সংজ্ঞা অনুযায়ী গুম হিসাবে বিবেচিত হয়। এর মধ্যে ২৮৭টি অভিযোগ ‘মিসিং অ্যান্ড ডেড’ ক্যাটাগরিতে পড়েছে। কমিশন জানায়, তদন্ত অনুযায়ী বরিশালের বলেশ্বর নদীতে সবচেয়ে বেশি হত্যাকাণ্ড ও লাশ গুমের ঘটনা ঘটেছে। শত শত গুমের শিকার ব্যক্তিকে হত্যা করে এই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। এছাড়া বুড়িগঙ্গা নদী ও মুন্সীগঞ্জেও লাশ গুম করে ফেলার প্রমাণ তদন্তে পাওয়া গেছে।

প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদন জমাদানকালে সংক্ষিপ্ত বৈঠকে এ প্রসঙ্গে কমিশন সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেন, ‘গুমের সংখ্যা ৪ থেকে ৬ হাজার হতে পারে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাদের মাধ্যমে আরও ভুক্তভোগীর খোঁজ পাওয়া যায়, যারা আমাদের সঙ্গে এখন পর্যন্ত যোগাযোগ করেননি, আমাদের সম্পর্কে জানেন না কিংবা অন্য দেশে চলে গেছেন। এমন অনেকেই আছেন, যাদের সঙ্গে আমরা নিজ থেকে যোগাযোগ করলেও তারা অন-রেকর্ড কথা বলতে রাজি হননি।’ তিনি বলেন, জোরপূর্বক গুমের পেছনে মূলত রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ছিল। যে ডেটা পেয়েছি, তা দিয়ে নিশ্চিত প্রমাণিত হয়-এসব পলিটিক্যালি মোটিভিটেড ক্রাইম।,

অক্লান্ত পরিশ্রম ও দৃঢ় মনোবলের জন্য গুম তদন্ত কমিশনের সদস্যদের ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ‘এটি একটি ঐতিহাসিক কাজ। জাতির পক্ষ থেকে আমি এই কমিশনের সবাইকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যে ঘটনার বর্ণনা করলেন, পৈশাচিক বলে যে শব্দ আছে বাংলায়, এককথায় বললে এই ঘটনাগুলোকে সেই শব্দ দিয়েই বর্ণনা করা যায়। এই নৃশংস ঘটনার মধ্য দিয়ে যারা গেছেন, আপনারাও তাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে, তাদের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সেই নৃশংস ঘটনাগুলোর কথা শুনেছেন। দৃঢ় মনোবল ছাড়া এ কাজ সম্পন্ন করা যেত না।’

Facebook
Twitter
WhatsApp
Pinterest
Telegram

এই খবরও একই রকমের

ইরানে ‘বৃহত্তম বোমাবর্ষণের’ হুঁশিয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রীর

অনলাইন ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, শনিবার (৭ মার্চ) রাতে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ‘বৃহত্তম বোমাবর্ষণ কর্মসূচি’ পরিচালিত হতে পারে। এতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র

স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী ঘোড়া’ প্রতীক পেলেন ইলিয়াস রেজা রবিন

জুয়েল রানা: সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) সলঙ্গা আসনের স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী মানবাধিকার কর্মী মো. ইলিয়াস রেজা রবিন। বুধবার (২১ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে প্রতীক

আশা জাগিয়েও মন্ত্রিত পেলেন না মির্জা আব্বাস

নিজস্ব প্রতিবেদক: শপথ নিয়েছেন নতুন মন্ত্রিসভার ২৫ মন্ত্রী ও ২৪ প্রতিমন্ত্রী। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিকেল

ইসরাইল-ইরান যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে: ট্রাম্প

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইসরায়েল ও ইরান একটি ‘সম্পূর্ণ ও সর্বাত্মক যুদ্ধবিরতিত’ সম্মত হয়েছে। নিজের মালিকাধীন সামাজিকমাধ্যম প্ল্যাটফর্ম ট্রুথ সোশ্যাল-এ দেওয়া এক

ভূঞাপুরে কমেছে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত

জহুরুল ইসলাম, স্টাফ রিপোর্টার: টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে কমেছে কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত, কমেছে চাঁদাবাজী, নেই মারামারি। কিশোর গ্যাংয়ের মদদদাতা উপজেলা পরিষদের সাবেক একজন ভাইস চেয়ারম্যান আত্মগোপনে থাকায়

যমুনায় যাচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী, থাকছেন গুলশানের নিজ বাড়িতেই

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় না উঠে রাজধানীর গুলশানের নিজ বাসাতেই থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর