কুরআনের পাঠশালা থেকে সর্বোচ্চ নেতৃত্বে, রণক্ষেত্রে সমাপ্তি খামেনেয়ি অধ্যায়

অনলাইন ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। রোববার (১ মার্চ) ভোরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম তার মৃত্যুর খবর প্রকাশ করে। তিনি ওই সময় অফিসে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিলেন।

ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ এজেন্সি জানায়, ‘শনিবার সকালে আমেরিকা ও জায়নিস্ট শাসনের যৌথ হামলায় ইসলামী বিপ্লবের নেতা গ্র্যান্ড আয়াতুল্লাহ ইমাম সাইয়্যিদ আলি খামেনেয়ি শাহাদাতবরণ করেছেন।’

আলি খামেনেয়ির মৃত্যুর মাধ্যমে ইরানে এক দীর্ঘ নেতৃত্বের অবসান হলো। ১৯৭৯ সালের ইরানের ইসলামি বিপ্লবের আদর্শিক নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি ১৯৮৯ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তার পরই ইরানের নেতৃত্বভার গ্রহণ করেন আলি খামেনেয়ি।

১৯৩৯ সালে ইরানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পবিত্র শিয়া নগরী মাশহাদে জন্মগ্রহণ করেন আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেয়ি। তিনি ছিলেন এক খ্যাতিমান মুসলিম আলেমের সন্তান ও প্রতিবেশী ইরাকে বসবাসকারী আজারবাইজানি বংশোদ্ভূত। তাদের পরিবার প্রথমে ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের তাবরিজে বসতি স্থাপন করে, পরে চলে আসে র্মীয় তীর্থযাত্রীদের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত মাশহাদে। সেখানে খামেনেয়ির বাবা একটি আজারবাইজানি মসজিদের ইমামতি করতেন।

খামেনেয়ি তার মা খাদিজেহ মিরদামাদিকে পবিত্র কুরআন ও বইপ্রেমী হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মায়ের কাছ থেকেই তিনি সাহিত্য ও কবিতার প্রতি ভালোবাসা অনুভব করেন। পরবর্তীতে পাহলভি রাজবংশবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত হলে মা-ই তাকে সমর্থন দেন।

চার বছর বয়সে কুরআন শিক্ষা দিয়ে খামেনেয়ির পড়াশোনা শুরু। মাশহাদের প্রথম ইসলামিক বিদ্যালয়ে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন। উচ্চমাধ্যমিক শেষ না করে তিনি ধর্মতাত্ত্বিক শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং সময়ের খ্যাতিমান আলেমদের কাছে পড়াশোনা করেন। যাদের মধ্যে ছিলেন তার বাবা ও শেখ হাশেম গাজভিনি। পরবর্তী সময়ে তিনি উচ্চতর শিয়া ধর্মীয় শিক্ষার জন্য নাজাফ ও কোমে অধ্যয়ন করেন।

কোমে তিনি বেশ কয়েকজন প্রখ্যাত আলেমের সান্নিধ্যে আসেন, যার মধ্যে ছিলেন আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি। শাহবিরোধী অবস্থানের কারণে তরুণ ধর্মশিক্ষার্থীদের মধ্যে খোমেইনির ব্যাপক জনপ্রিয়তা ছিল। খোমেইনি ফিকহ (ইসলামি আইনশাস্ত্র) ও তাফসিরের ক্লাস নিতেন, যার মাধ্যমে তিনি বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেন। এ সময় অনেক তরুণ রাজতন্ত্রে হতাশ হয়ে বিকল্প কিছুর জন্য ঝুঁকছিলেন।

১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৬ ও মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ সমর্থিত এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এর পর রাজতন্ত্র পুনরায় পূর্ণ ক্ষমতা ফিরে পায়। রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে খামেনেয়িকে একাধিকবার শাহের গোপন পুলিশ সাভাক গ্রেপ্তার করে। তাকে দক্ষিণ-পূর্ব ইরানের প্রত্যন্ত শহর ইরানশাহরে নির্বাসনেও পাঠানো হয়। তবে ১৯৭৮ সালের গণআন্দোলনে অংশ নিতে তিনি ফিরে আসেন, যা শেষ পর্যন্ত পাহলভি শাসনের পতন ঘটায়।

রাজতন্ত্র পতনের পর নতুন ইরান রাষ্ট্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন খামেনেয়ি। ১৯৮০ সালে তিনি অল্প সময়ের জন্য প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন এবং ইরান-ইরাক যুদ্ধ শুরুর পর আইআরজিসির তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি তেহরানের জুমার নামাজের খতিব হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। ১৯৮১ সাল তার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। বিরোধী সংগঠন মোজাহেদিন-ই খালক(এমইকে)-এর এক হত্যাচেষ্টা থেকে অল্পের জন্য রক্ষা পেলেও তিনি তার ডান হাতের কার্যক্ষমতা হারান। একই বছরে তিনি ইরানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

১৯৮৯ সালে রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর সংবিধান সংশোধনের জন্য গঠিত একটি পরিষদ খামেনেয়িকেই সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে নিয়োগ দেয়। প্রেসিডেন্ট থাকাকালে ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধ পরিচালনা করার সময়ই তার মনে যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের প্রতি গভীর অবিশ্বাস তৈরি করে।

খামেনেয়ির আমলেই ইসলামিক রেভ্যুলশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) আধা সামরিক বাহিনী থেকে একটি শক্তিশালী সামরিক-রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়। আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারে এবং দেশের নিরাপত্তা কাঠামো জোরদারে এই বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তিনি পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে ‘রেজিস্ট্যান্স ইকোনমি’ বা প্রতিরোধ অর্থনীতির ধারণা সামনে আনেন, যার লক্ষ্য ছিল আত্মনির্ভরতা বৃদ্ধি। একই সঙ্গে পশ্চিমাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিককরণ বিষয়ে বরাবরই সন্দিহান ছিলেন তিনি।

ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছে যে ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা তাদের জন্য হুমকি। কিন্তু তেহরান বারবার বলে আসছে, তাদের পারমাণবিক বোমা তৈরির কোনো ইচ্ছা নেই। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে তীব্র সংঘাত চলে। ইরান তেল আবিব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে পাল্টা জবাব দেয়। তখন যুক্তরাষ্ট্রও ইরানে হামলা চালায়।,

জুনের হামলার পর ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে তেহরানের পরোক্ষ আলোচনা শুরু হয়। আলোচনায় মধ্যস্থতা করছিল ওমান। দুই দিন আগে ওমানের মধ্যস্থতাকারীরা জেনেভা আলোচনায় অগ্রগতির কথা জানানোর পরপরই ইরানে বর্তমান হামলা শুরু হয়।

২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প ঘোষণা দেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ‘বড় সামরিক অভিযান’ শুরু করেছে এবং ইঙ্গিত দেন, তারা শাসন পরিবর্তন চায়। এর একদিন পরই খামেনেয়ির মৃত্যুর সংবাদ আসে। তার মৃত্যুর মাধ্যমে ইরানের তিন দশকের বেশি সময়ের এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের অবসান হলো। দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এখন নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

তথ্যসূত্র: আল জাজিরা

Facebook
Twitter
WhatsApp
Pinterest
Telegram

এই খবরও একই রকমের

আগামী বছর থেকে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা করতে পারবে না সাদপন্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: নেতৃত্ব নিয়ে বিরোধে বাংলাদেশে তাবলিগ জামাত দুটি প্রধান গ্রুপে বিভক্ত হয়ে আছে। তাদের এক গ্রুপের টঙ্গী ময়দানে তাবলীগ জামায়াত বাংলাদেশ (মাওলানা সা’দ এর

বেলকুচিতে ভূমি মেলা ২০২৫ এর উদ্বোধন

জহুরুল ইসলাম স্টাফ রিপোর্টার: সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে ভূমি মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। রবিবার (২৫ মে) সকালে উপজেলা ভূমি অফিস চত্বরে ভূমি মেলা উদ্বোধন করেন বেলকুচি উপজেলা নির্বাহী

৭৪ লাখ টাকাসহ আটক হওয়া সেই জামায়াত নেতার হার্ট অ্যাটাক, সিসিইউতে ভর্তি

নিজস্ব প্রতিবেদক: নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে ৭৪ লাখ টাকাসহ আটক হওয়া ঠাকুরগাঁও জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির বেলাল উদ্দিনকে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বর্তমানে

স্বাধীনতার সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে: রাষ্ট্রপতি

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, স্বাধীনতার প্রকৃত সুফল জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে হলে গণতন্ত্রকে আরও শক্তিশালী ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয়

বড় ধাক্কায় পড়তে পারে পোশাক খাত

নিজস্ব প্রতিবেদক: প্রস্তুতি ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর ভয়াবহ প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৬ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশ

১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে সরকারের লোকসান ৫০ হাজার কোটি টাকা

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিগত সরকার তীব্র বিদ্যুৎ সংকটকে অর্থ লুটের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করেছে। দায়মুক্তি অধ্যাদেশ জারি করে অপরাধকে আড়ালে রাখা হয়েছে। রোববার বিদ্যুৎ ভবনে আয়োজিত