আমার সোনার বাংলা সত্যিকারের সোনার বাংলা হোক, এই প্রত্যাশা

গত ৬ অক্টোবর দুপুরে বনানী স্টার কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্টে আমার উপর হামলার ঘটনায় স্টার কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্টের ১১ জন জেল খেটেছে, তাদের প্যাডে, স্ট্যাম্পে ও ফেসবুক পেজে নিঃশর্ত লিখিত ক্ষমা চেয়েছে, তাদের সার্ভিস ও খাবারের মান উন্নত করার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং আমি ক্ষতিপূরণ বা চিকিৎসা খরচ না নিয়ে আমার নির্ধারণ করা এতিমখানায় ১০০০ এতিম শিশুকে খাওয়ানোর শর্ত মেনে লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়ায় তাদের ক্ষমা করেছি।

সেদিনের প্রকৃত সত্য জনগণের কাছে তুলে ধরায় গণমাধ্যম কর্মী ভাই ও বন্ধুদের আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনারা পাশে না থাকলে আমি হয়তো এই ঘটনার বিচার চাওয়া পর্যন্ত যেতে পারতাম না। অন্যায় দেখে সবাই মুখ চেপে চলে আসে। পঁচা বাসি খাবার একাধিক গ্রাহককে দেওয়া যত কম টাকার বিষয়ই হোকনা কেনো, তা অন্যায়। তাই প্রতিবাদ করেছি। রক্তাক্ত হয়েও এক ঘন্টা রক্ত ঝরা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থেকে আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধু ও আইনের লোকদের জন্য অপেক্ষা করে এই ঘটনার বিচার ও শাস্তি দাবী করেছি। আমি বিশ্বাস করতে চাই, বাংলাদেশ ব্যর্থ হবে না। বিশ্বাস করতে চাই, জাতীয় সংগীতের মতো আমার সোনার বাংলা সত্যিকারের বৈষম্যমুক্ত সোনার বাংলা হবে, আমরা ইউরোপ আমেরিকার মতো অর্থনৈতিকভাবে উন্নত হওয়ার আগে চারিত্রিক ও ব্যবহারগত ভাবে তাদের মতোই উন্নত হবো। তাই রক্ত ঝরলেও আমি এই ক্ষুদ্র বিষয়ের প্রতিবাদ করেছি কিছু ভালো পরিবর্তনের প্রত্যাশায়।

৬ অক্টোবর দুপুর ৩ টায় আমার এক বন্ধু সহ বনানী স্টার কাবাব এ দুপুরের খাবার খেতে যাই। ওয়েটারকে মেন্যু জিজ্ঞেস করে খাসির কাচ্চি দিতে বলি। আমার বন্ধু আগেই খেয়ে আসায় আমি একাই খাওয়া শুরু করি। অতঃপর কাচ্চির ভিতরে থাকা টিক্কা খাওয়ার সময় তাতে দুর্গন্ধ পাই এবং ম্যানেজারের কাছে অভিযোগ দেই। ম্যানেজার টিক্কা চেক না করেই বলেন, টিক্কা এমনই হয়। আমি বলি, টিক্কা তো সামনেই আছে, আপনি গন্ধ দেখেন। সে না দেখে বলে, টেবিলে বসে খান। টিক্কা এমনই হয়, জীবনে খাননাই টিক্কা। এতে আমি উচ্চস্বরে এবিষয়ের প্রতিবাদ করলে আরও তিনজন বিভিন্ন টেবিল থেকে তাদের টিক্কাও গন্ধ বলে জানায়। এতে ম্যানেজার দুঃখ প্রকাশ না করলে আমি উত্তেজিত হই। সেসময় ম্যানেজার কলিংবেল বারবার চেপে হোটেলের ১২ থেকে ১৪ জন ওয়েটার ও কয়েকজন দালালকে মুহূর্তের মধ্যে ডেকে আনে। তারা জড়ো হয়ে আমাকে ঘিরে ফেলে। এসময় তারা চিৎকার করতে থাকে বনানী তাদের জায়গা। তাদের জায়গায় বসে খাবার যেমনই হোক, প্রতিবাদ করার সাহস আমি কীভাবে পাই বলতে বলতে আমাকে আক্রমণ শুরু করে। এতে দোতলা থেকে স্টাফ ও দালাল মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ জন আমাকে নীচতলায় যেখানে সিসিটিভি নেই সেখানে নিয়ে যায়। আমি চলে যেতে চাইলে তারা আমাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে মাথায়, পেটে, বুকে, পিঠে, হাতে ও পায়ে উপর্যুপরি লাত্থি দেয় এবং গলা চেপে ধরে। তারা ১৪-১৫ জন এবং আমি একা হওয়ায় জোশের বশে তারা কি করছিলো তাও সম্ভবত তারা বুঝতে পারছিলো না। এই সম্পূর্ণ ঘটনা ৪০ থেকে ৫০ সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যায়। আমার ডানহাতে প্রচন্ড আঘাত পাই, ডানকপাল চোখের উপরে কেটে রক্ত পড়ে ফ্লোর ভিজে যায়। রক্ত দেখে তাদের মধ্যে সম্ভবত কিছুটা সম্বিত ফিরে আসে যে তারা কি করছে। এর মধ্যে কয়েকজন গ্রাহক এসে আমাকে উদ্ধার করে এবং দালাল ও স্টাফরা দৌড়ে স্টার কাবাব ও রেস্টুরেন্টের বিভিন্ন তলায় পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আমি রক্তমাখা কপাল, চোখ, মুখ ও শরীর নিয়ে অপ্রস্তুত হয়ে যাই। ডান হাত ও ডান পায়ে ছিলো অসহনীয় ব্যাথা। পুরো শরীরও নাড়াতে পারছিলাম না। এর মধ্যে ওদের কয়েকজন দালাল আবার এসে আমাকে পাশের কোন হাসপাতালে নিতে চায়, যাতে এই ঘটনা থানা পর্যন্ত না যায়। আমি উপস্থিত লোকজনকে থানায় ফোন দিতে বললে দালালরা বলতে থাকে, এটা তাদের বনানী, ওদের এলাকা। তাদের কেউ কিছু করতে পারবে না, তাদের সব কেনা, ওই এলাকার রাজনীতিবিদ, থানা কেনা। আমি যাতে হাসপাতালে চলে যাই এবং এটা নিয়ে কোথাও অভিযোগ না দেই। উপস্থিত জনগণ দালালদের কথার প্রতিবাদ করে এবং থানায় খবর দেয়। থানা থেকে এসআই একজন তার টিম সহ আসে যারা আমাকে হাসপাতালে যেতে বলে। তবে আমি আক্রমনকারীদের আটক করার পর হোটেল ত্যাগ করবো বলে জানালে তারা নিশ্চুপ হয়ে থাকে। এসময় আমি আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের জানালে তারা বনানী জোনের ডিসি, এসি ও ওসিকে ফোন দেন। কিছুক্ষণ পর ডিসি ও ওসির নির্দেশে অন্য একটি টিম এসে আমার প্রাথমিক অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যানেজার সহ ১০-১১ জনকে নজরদারিতে রাখে এবং আমাকে সরকারি কোন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে তার স্লিপ ও অভিযোগ নিয়ে আসতে বলে। এর মধ্যে আমার ছয়জন গণমাধ্যম কর্মী বন্ধু আসে, যারা তাৎক্ষণিক উপস্থিত জনতার সাক্ষাৎকার নেয় এবং সঠিক ঘটনা তুলে ধরে সংবাদ প্রচার করে। আমার চাহিদার ভিত্তিতে বনানী থানা পুলিশ বিকাল ৫ টায় তাদের গাড়িতে করে কুর্মিটোলা হাসপাতালে নিয়ে যায়, চিকিৎসা করায়। এর মধ্যে আমার বন্ধুরা বনানী স্টার কাবাব এর সামনে জড়ো হয়। আমি সন্ধ্যা ৭ টায় আমার গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের সাথে নিয়ে বনানী থানায় যাই এবং ম্যানেজার সহ স্টাফদের বিরুদ্ধে মামলা করি।

মামলায় ১১ জনকে রাতেই আটক করা হয়। স্টার কাবাব কর্তৃপক্ষ ঘটনার পর প্রথমে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ভাবে বিষয়টি মোকাবেলা করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে। মামলা যাতে থানা না নেয় এবং কাউকে যাতে গ্রেফতার হতে না হয় তার জন্য তারা সর্বোচ্চ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক শক্তি ব্যবহার করে। ৬ অক্টোবর রাতে আমি মামলা করতে গেলে বিভিন্ন প্রভাবশালী জায়গা থেকে ফোন আসা শুরু হয়। তবে গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের সহায়তায় তারা তাতে ব্যর্থ হয়। বাস্তব জীবনে দেখা, ক্ষমতাবানদের দুটি হাত থাকে। প্রথম হাত দিয়ে গলা চেপে ধরে, তাতে না পারলে পায়ে ধরে। গণমাধ্যম কর্মী বন্ধুদের সহায়তায় এবং জনগণ আমার পাশে থাকায় ক্ষমতায় না পেরে তারা ক্ষমা চাওয়ার পথে যায়। সেদিন রাতেই থানায় ম্যানেজার এসে পায়ে ধরে মাফ চায়। তবে তাদের নূন্যতম জেল না খাটিয়ে ক্ষমা করতে মানসিকভাবে আমার সায় ছিলো না। সেদিন রাতে ম্যানেজার সহ ১১ জন হাজতে থাকে। আমি মনে করি, তারা তাদের মালিকপক্ষের ক্ষমতার দাম্ভিকতায় আমার উপর আক্রমণ করেছে, আমাকে রক্তাক্ত করেছে। তারা হয়তো ভেবেছিলো, বনানী তাদের এলাকা, এখানে কেউই তাদের আইনের আওতায় আনতে পারবে না।

আমার প্রত্যাশা ছিলো, আইনে উর্ধ্বে কেউ নয়, আইনের চেয়ে শক্তিশালী কেউ নয় সেই বার্তা সবার কাছে যাক৷ দেশের মানুষ সকল গণমাধ্যমে এই সংবাদ দেখেছে, খাবারের বিষয়ে সচেতন হয়েছে। সকল রেস্টুরেন্ট খাবারের মানের বিষয় সতর্ক হবে, তারাও জানবে পঁচা খাবার দিলে তারাও আইনের আওতায় আসতে বাধ্য এই বার্তা কিছুটা হলেও গিয়েছে।

ঘটনার পর গত দুদিন স্টার কাবাব কর্তৃপক্ষ বিভিন্নভাবে যোগাযোগ করে ক্ষমা চেয়েছে। ১১ জন গ্রেফতারকৃত কর্মচারী যারা আমার উপর হামলা করেছিলো, তারাও নানাভাবে ক্ষমা চেয়েছে, অনুতপ্ত হয়েছে, তাদের পরিবারের কথা বলে মাফ করে দিতে বলেছে । মামলা চলমান রাখলে তাদের হয়তো কয়েক মাস জেল হতো। আমি চেয়েছিলাম একটি গুণগত পরিবর্তনের সূচনা, যা আশাকরি শুরু হয়েছে। ১১ জনের পরিবার, বাবা মা, সন্তানের দিকে তাকিয়ে স্টার কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষকে আমি ক্ষমার জন্য কিছু শর্ত দিয়েছিলাম।

স্টার কাবাব কর্তৃপক্ষ লিখিতভাবে নিঃশর্ত ক্ষমা প্রার্থনা করলে ও কোনপ্রকার চিকিৎসা ব্যয় বা আর্থিক ক্ষতিপূরণ আমি না নিয়ে ১০০০ এতিমকে স্টার কাবাব কর্তৃপক্ষ একবেলা বিনামূল্যে খাওয়ালে তাদের ক্ষমা করার শর্ত দিয়েছিলাম। শর্তগুলো মেনে তারা লিখিত প্রতিশ্রুতিপত্র দিয়েছে।

স্টার কাবাব এন্ড রেস্টুরেন্ট কর্তৃপক্ষ পঁচা খাবার দেওয়া এবং গ্রাহককে পিটিয়ে রক্তাক্ত করার জন্য গ্রাহক, সাংবাদিক সমাজ ও জনগণের কাছে নিঃশর্তভাবে লিখিত ক্ষমা চেয়েছে।

তাদের সার্ভিস ও খাবারের মান উন্নত করার প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে লিখিতভাবে দিয়েছে।

আমাকে কোন চিকিৎসা ব্যয় ও কোনপ্রকার আর্থিক ক্ষতিপূরণ দিতে হবে না (আমি নেবো না), তবে ক্ষমার শর্ত হিসেবে আগামী ১৫ অক্টোবরের মধ্যে ১০০০ এতিমকে আমার দেওয়া এতিমখানার লিস্ট অনুসারে একবেলা বিনামূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়ার লিখিত প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

একটি সুন্দর পরিবর্তনের প্রত্যাশায় অসততা ও ক্ষমতার দাম্ভিকতার বিরুদ্ধে আমার সেদিনের প্রতিবাদ। আশা করি আমার রক্ত ঝরা প্রতিবাদ থেকে পরিবর্তনের সমুদ্রে একবিন্দু হলেও জল সংযুক্ত হবে, একটি সুন্দর আগামীর পথে এক কদম আগানো হবে।

ক্ষমতা ও বিচারহীনতা মানুষকে পশুতে পরিণত করে। তাদের গ্রেফতার ও পরবর্তী লিখিত ক্ষমা প্রার্থনা করায় সমাজের কাছে একটি বার্তা যাক, মানুষ যাতে আইনের ভয়েও মানুষ হয়ে ওঠে। আমরা মানুষ হয়ে জন্ম নিয়েছি, যাতে মানুষ হয়েই মৃত্যুবরণ করতে পারি; সুন্দর, উন্নত, বৈষম্য মুক্ত সোনার বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখতে পারি। আল্লাহ সবার মনের নেক প্রত্যাশা পূরণ করুন। আমিন।

কৃষিবিদ সালেহ মোহাম্মদ রশীদ অলক

গণমাধ্যম কর্মী।

 

Facebook
Twitter
WhatsApp
Pinterest
Telegram

এই খবরও একই রকমের

সিরাজগঞ্জে ট্রিপল মার্ডারের আসামির জামিন, ‘ভারতে পালানোর চেষ্টা’

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: সিরাজগঞ্জের তাড়াশে বাবা-মা ও মেয়েকে গলাকেটে হত্যা মামলার আসামি রাজীব কুমার ভৌমিক (৩৪) জামিন পেয়েছেন। এ ঘটনায় এলাকায় সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্কের পাশাপাশি

এবার ইসরায়েলে ইরানি হামলা: ৮০ ড্রোন ও ৬ মিসাইল ভূপাতিতের দাবি আমেরিকার’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে নিজের কনস্যুলেটে হামলার জেরে ইসরায়েলকে নজিরবিহীন জবাব দিয়েছে ইরান। রবিবার (১৪ এপ্রিল’) রাতে প্রতিশোধ নিতে ইসরায়েলের মাটিতে তিন শতাধিক ড্রোন

এবার বিএনপিতে স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠনের তোড়জোড়

নিজস্ব প্রতিবেদক: বিভিন্ন কমিটিগুলো তছনছ করে দেওয়ার পর তারেক জিয়ার এবারের মনোযোগ বিএনপির স্থায়ী কমিটি পুনর্গঠনের দিকে। স্থায়ী কমিটিতে পাঁচটি শূন্যপদ রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত

ইবি শিক্ষক-কর্মকর্তাদের নজিরবিহীন দখলদারিত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক: দুই বছর আগে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মকর্তাদের বসবাসের জন্য ডরমেটরি-২ ভবনের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। তবে দুই বছর পেরোলেও নিয়মতান্ত্রিকভাবে ডরমেটরিতে কাউকে বাসা বরাদ্দ

জন্মের পরই দেওয়া হবে এনআইডি : মন্ত্রিপরিষদ সচিব

শর্তসাপেক্ষে ‘জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন আইন, ২০২২’-এর খসড়ার নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। খসড়া আইনে জন্মের পরপর জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। ১০ অক্টোবর দুপুরে সচিবালয়ে

রাজবাড়ীতে ছাত্রদল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দে ফারুক সরদার (২৫) নামে এক ছাত্রদল কর্মীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার (১২ অক্টোবর’) রাতে উপজেলার দৌলতদিয়া যৌনপল্লীতে এ ঘটনা ঘটে।