আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করব: জামায়াত আমির

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করব। আমরা আগেও তা প্রমাণ করেছি। আমাদের সাবেক আমিরে জামায়াত ও সেক্রেটারি জেনারেল তিনটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দুর্নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সততার সঙ্গে দেশ সেবা করেছেন।

মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দলটি পলিসি সামিট ২০২৬ আয়োজন করেছে। এতে কি নোট উপস্থাপনকালে জামায়াত আমির এসব মন্তব্য করেন।

এক লিখিত বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের পথচলা গড়ে উঠেছে স্বাধীনতার এক দীর্ঘ ও এখনো অসমাপ্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে—রাজনৈতিক স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং মানবিক মর্যাদার সংগ্রাম। ১৯৪৭ সালে এই ভূখণ্ডের মানুষ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি চেয়েছিল, এই আশায় যে স্বাধীনতা ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও সুযোগ এনে দেবে। ১৯৭১ সালে অপরিসীম ত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, এই প্রতিশ্রুতির ওপর দাঁড়িয়ে যে রাজনৈতিক স্বাধীনতা সামাজিক ন্যায়বিচার ও অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুলে দেবে। কিন্তু পাঁচ দশকেরও বেশি সময় পার হলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো পূর্ণ হয়নি।

তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়েছে, জবাবদিহিতা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়েছে, আর নাগরিকরা বারবার তাদের ন্যায্য কণ্ঠস্বর থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। গত সতেরো বছরে শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতা ও কর্তৃত্ববাদী চর্চা প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভিতর থেকে ফাঁপা করে দিয়েছে এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সংকুচিত করেছে। আর ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আবারও মানুষ, বিশেষ করে আমাদের তরুণরা, তাদের কণ্ঠ, অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের জন্য দাঁড়িয়ে যায়।

বর্তমান পরিস্থিতির ভিত্তিতে সামগ্রিক চ্যালেঞ্জের বিষয়ে বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনের অন্ধকার সময় পার করে আমরা এখন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে—গণতান্ত্রিক রূপান্তরের একটি সময়ে, যেখানে দেশ পুনর্গঠনে আমাদের সামনে এখনও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। আজ আমাদের চ্যালেঞ্জ টিকে থাকা নয়, বরং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। অর্থনীতি বেড়েছে, কিন্তু কাজের মান কমেছে। বেকারত্ব ও মূল্যস্ফীতি আমাদের দৈনন্দিন জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অধিকাংশ কর্মসংস্থান অনানুষ্ঠানিক, অনিরাপদ ও কম মজুরির। তরুণ গ্র্যাজুয়েটরা শিক্ষাকে সুযোগে রূপ দিতে হিমশিম খাচ্ছে। নারীরা এখনও সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা বাধার মুখে পড়ছেন। লাখো মানুষ প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করেও সামান্য একটি ধাক্কায় সংকটে পড়ে যাওয়ার অবস্থায় আছেন। এই বাস্তবতাগুলোকে আমাদের সৎভাবে মোকাবিলা করতে হবে। শুধু প্রবৃদ্ধি আর যথেষ্ট নয়। অর্থনৈতিক সাফল্য মাপতে হবে এই প্রশ্নে—মানুষ কি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিকল্পনা করতে পারছে, মর্যাদার সঙ্গে পরিবার চালাতে পারছে, এবং সমাজে অর্থবহভাবে অংশ নিতে পারছে কি না।

সম্ভাবনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশ এক বিশাল সম্ভাবনাময় দেশ। আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ আমাদের মানুষ। বাংলাদেশে রয়েছে একটি তরুণ, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পরিশ্রমী কর্মশক্তি, যারা চাপের মধ্যেও বারবার দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। কৃষি থেকে শিল্প, সেবা খাত থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোগ—সব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশি শ্রমিকরা সীমিত স্বীকৃতি ও সহায়তার মধ্যেও অর্থনীতিকে সচল রেখেছেন।

প্রবাসীদের প্রশংসা করে জামায়াত আমির বলেন, দেশের বাইরে লাখো প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিক তাদের শ্রম ও ত্যাগের মাধ্যমে গভীর দেশপ্রেমের পরিচয় দিচ্ছেন। তাদের পাঠানো রেমিট্যান্স পরিবারকে সহায়তা করে, অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে এবং বাংলাদেশকে বৈশ্বিক শ্রমবাজারের সঙ্গে যুক্ত করে। তবে তাদের অবদান শুধু অর্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তারা দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা নিয়ে আসেন, এবং অনেকেই আরও বড়ভাবে অবদান রাখতে আগ্রহী।

নারীদের ভূমিকার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভবিষ্যতে নারীদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘদিনের কাঠামোগত বাধা সত্ত্বেও নারীরা ইতোমধ্যে জাতি গঠনে সক্রিয়—শিক্ষক, স্বাস্থ্যকর্মী, উদ্যোক্তা, স্থানীয় নেতা ও সামাজিক উদ্ভাবক হিসেবে। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো শুধু ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি অর্থনৈতিক প্রয়োজন। জনসংখ্যার অর্ধেককে পূর্ণ অংশগ্রহণ থেকে বাদ দিয়ে কোনো দেশ টেকসইভাবে সমৃদ্ধ হতে পারে না।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, রাষ্ট্র যখন ন্যায্য ও পূর্বানুমেয়ভাবে সেবা দেয়, তখন নাগরিকরা আস্থা, আইন মেনে চলা ও উদ্যোগের মাধ্যমে সাড়া দেয়। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি বাস্তবায়ন করব। আমরা আগেও তা প্রমাণ করেছি। আমাদের সাবেক আমিরে জামায়াত ও সেক্রেটারি জেনারেল তিনটি মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং দুর্নীতিকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সততার সঙ্গে দেশ সেবা করেছেন। পাশাপাশি এটিও প্রমাণিত হয়েছে যে আমাদের নেতাদের দক্ষতা ও সততা প্রশাসনিক দক্ষতায় রূপ নিয়েছে।

সবশেষে তিনি বলেন, আপনাদের সঙ্গে নিয়ে আমরা ইনসাফ, মর্যাদা ও যৌথ সমৃদ্ধির ভিত্তিতে একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই। ইনশাআল্লাহ, আমাদের জুলাইয়ের শহীদ বীরদের—আবু সাঈদ, মুগ্ধ, সান্তো, ওয়াসিম ও ওসমান হাদির—ত্যাগ বৃথা যাবে না। আমাদের মানুষের শক্তি, প্রবাসীদের অঙ্গীকার, নারীদের নেতৃত্ব, তরুণদের উদ্যম এবং বিশ্বজুড়ে বন্ধুদের সমর্থন নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা রাখে। আমরা সবার জন্য একটি ন্যায্য, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ে তুলব।,

Facebook
Twitter
WhatsApp
Pinterest
Telegram

এই খবরও একই রকমের

গণতন্ত্রের পথে নতুন অধ্যায়, রাষ্ট্রপতির বিশেষ বার্তা

নিজস্ব প্রতিবেদক: রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, গণ-অভ্যুত্থান দিবস বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ইতিহাসে একটি অনন্য ও গুরুত্বপূর্ণ দিন। ২৪ জানুয়ারি গণ-অভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে

সলঙ্গায় ৯০ বছর বয়সী বিদ্ধের জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ

জুয়েল রানা: সিরাজগঞ্জের সলঙ্গায় ৯০ বছর বয়সী নাজিম আলি আকন্দ নামে এক বিদ্ধের জমি জোরপূর্বক দখলের অভিযোগ উঠেছে একই এলাকার হান্নান গংদের বিরুদ্ধে। শুক্রবার সকালে

৬ মাসের মধ্যে আরেকটি নির্বাচনের সমঝোতা হয়েছিল আ.লীগ-বিএনপি-জামায়াতের

ডেস্ক রিপোর্ট: ২০১৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন নিয়ে এবার মুখ খুলেছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া। তিনি বলেছেন, ওই নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও

সিরিয়ায় আসাদ অনুগতদের সঙ্গে সরকারি বাহিনীর সংঘর্ষে ৪১ জন নিহত

অনলাইন ডেস্ক: সিরিয়ায় বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে পালিয়ে যাওয়া সাবেক প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের অনুগত যোদ্ধাদের সঙ্গে দেশটির বর্তমান প্রশাসনের নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে।

বাস চালককে অন্যায়ভাবে মারপিটের অভিযোগ উঠেছে শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি সুলতান ও তার ছেলের বিরুদ্ধে

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি: বাস যাতায়াতকে কেন্দ্র করে বাস চালক রিপনকে ক্ষমতার প্রভাব খাটিতে জোড়পুর্বক বাড়ি থেকে তুলে এনে গণপিটুনী দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে সিরাজগঞ্জ জেলা মটর শ্রমিক

প্রতিষ্টাবার্ষিকী উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা ও পৌরসভা ছাত্রদলের বর্ণাঢ্য র‍্যালী

বাঁশখালী (চট্টগ্রাম) প্রতিনিধি: বাংলাদেশ জাতীয়তবাদী ছাত্রদলের ৪৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষে বাঁশখালী উপজেলা ও পৌরসভা ছাত্রদলের উদ্যোগে বর্ণাঢ্য র‍্যালী অনুষ্ঠিত হয়। বুধবার এ র‍্যালীটি মিয়ারবাজার থেকে