
নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার জ্বালানি পণ্য আমদানি করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস এলএনজি, পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল, এলপিজি এবং কয়লা। গত এক দশকে জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা জ্বালানি খাতকে উচ্চ ব্যয়, ভর্তুকি এবং বৈদেশিক মুদ্রার চাপে ফেলেছে।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ না হওয়ায় উৎপাদন কমেছে। একই সঙ্গে মজুদ অবকাঠামো ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতি ছিল। ফলে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে আমদানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো হয়।
বর্তমানে বছরে প্রায় ৭০ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়, যার পেছনে ব্যয় হয় আনুমানিক ৬০ থেকে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। দেশে ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত ইস্টার্ন রিফাইনারির পরিশোধনক্ষমতা ১৫ লাখ টনে সীমাবদ্ধ রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিট স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রিফাইনারির সক্ষমতা বাড়ানো গেলে পরিশোধিত জ্বালানি তেলের আমদানি কমানো এবং সংকটকালে মজুদ বাড়ানো সম্ভব হতো। বর্তমানে বছরে প্রায় ৫০ থেকে ৫৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে।
স্বাধীনতার পর শেল অয়েলের মালিকানাধীন তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাসটিলা, বাখরাবাদ ও রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্র রাষ্ট্রীয় মালিকানায় নেওয়ার মাধ্যমে গ্যাস খাতে দেশীয় সক্ষমতার ভিত্তি গড়ে ওঠে। ১৯৭৫ সালের ৯ আগস্ট এ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। বর্তমানে দেশীয় সরবরাহকৃত গ্যাসের প্রায় ৮০ শতাংশ এসব ক্ষেত্র থেকে আসে।
১৯৯৫ সালে প্রডাকশন শেয়ারিং কন্ট্রাক্টের আওতায় মার্কিন কোম্পানি Chevron বিবিয়ানা, মৌলভীবাজার ও জালালাবাদ গ্যাসক্ষেত্রে কার্যক্রম শুরু করে। বিশেষ করে বিবিয়ানা গ্যাসক্ষেত্র দেশের উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। তবে পরবর্তী সময়ে অফশোর ব্লকে অনুসন্ধান কার্যক্রম ধারাবাহিকতা পায়নি।
২০১৫ সালের পর দেশে গ্যাসের ঘাটতি প্রকট আকার ধারণ করে। ২০১৭ সালে সরকার গ্যাস সেক্টরের জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করে এবং ২০১৮ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে এলএনজি আমদানি শুরু হয়। পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮-১৯ অর্থবছর থেকে পরবর্তী সাত অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানি করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরেও ৫১ হাজার কোটি টাকার এলএনজি আমদানির প্রাক্কলন রয়েছে। এ সময়ে এলএনজি আমদানির ব্যয় মেটাতে ৩৫ হাজার কোটি টাকার বেশি ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে এবং বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও বেড়েছে।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সাবেক উপদেষ্টা তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী এবং সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের দায়িত্বকালেই এলএনজি আমদানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট মহলে এ নীতি নিয়ে সমালোচনা রয়েছে। তবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ থেকে নীতিগত সিদ্ধান্তকে জ্বালানি নিরাপত্তার প্রয়োজনীয়তা হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার কিছু আইনি সংস্কার ও পর্যালোচনা উদ্যোগ নেয়। তবে সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে এলএনজি আমদানি অব্যাহত থাকে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বিশেষ আইন বাতিল এবং কিছু চুক্তি পর্যালোচনার উদ্যোগ নেন। তা সত্ত্বেও আমদানিনির্ভর কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসেনি।
দেশে বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। এসব কেন্দ্র চালাতে বছরে অন্তত ১৭ হাজার কোটি টাকার কয়লা আমদানি করা হয়। দেশে পাঁচটি খনিতে উল্লেখযোগ্য কয়লা মজুদ থাকলেও তা উত্তোলনে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়নি।
গভীর সমুদ্রে অন্তত ২৬টি ব্লক অনুসন্ধানের অপেক্ষায় রয়েছে। সমুদ্রসীমা নির্ধারণের পর প্রতিবেশী দেশগুলো তাদের অংশে গ্যাস অনুসন্ধান এগিয়ে নিলেও বাংলাদেশে প্রত্যাশিত অগ্রগতি হয়নি।
অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ এবং জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক বদরূল ইমামসহ সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, জ্বালানি খাতে স্বনির্ভরতা অর্জনে বড় বিনিয়োগ, কার্যকর অনুসন্ধান পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি নীতি প্রয়োজন। অন্যথায় বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রভাব দেশের জ্বালানি নিরাপত্তায় ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।











