রাখাইনের ভবিষ্যৎ কোন পথে: নির্বাচন, ভূরাজনীতি ও অনিশ্চয়তার সমীকরণ

অনলাইন ডেস্ক: মিয়ানমারে বিতর্কিত নির্বাচনের পর সামরিক নেতৃত্বের প্রভাব অক্ষুণ্ন রেখে বেসামরিক সরকার গঠনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। একই সময়ে বাংলাদেশেও নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। তবে এ দুই রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাত, নিয়ন্ত্রণ সংকট ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলগত অবস্থান ও অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ মিলিয়ে রাখাইনের ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত।

নির্বাচনের পরও সীমিত নিয়ন্ত্রণ

মিয়ানমারের সামরিক কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, দেশের ৩৩০টি টাউনশিপের মধ্যে ২৬৫টিতে ভোট আয়োজন সম্ভব হয়েছে। বাস্তবে দেশের উল্লেখযোগ্য অংশ এখনো কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বাইরে। সীমান্তবর্তী ও জাতিগত অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বিভিন্ন সশস্ত্র সংগঠন সমান্তরাল প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলেছে। রাখাইন রাজ্যের বড় অংশ বর্তমানে আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ফলে নির্বাচন আয়োজনের মধ্য দিয়ে প্রশাসনিক উপস্থিতির বার্তা দেয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতিতে তেমন পরিবর্তন আসেনি।

চীনের করিডোর ও কৌশলগত হিসাব

চীন নির্বাচনকে স্বাগত জানিয়ে নেপিদোর সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার ইঙ্গিত দিয়েছে। চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডোর, কিয়াউকফিউ গভীর সমুদ্রবন্দর, তেল-গ্যাস পাইপলাইন ও সম্ভাব্য রেল-সড়ক সংযোগ প্রকল্প বেইজিংয়ের বৃহত্তর কৌশলের অংশ। রাখাইন হয়ে ইউনান পর্যন্ত সংযোগ স্থাপনের পরিকল্পনা মালাক্কা প্রণালির ওপর নির্ভরতা কমানোর লক্ষ্য বহন করে।

তবে যেসব এলাকায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা, তার বড় অংশই এখন কেন্দ্রীয় সরকারের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে নেই। সাম্প্রতিক সময়ে চীন জান্তা নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ জোরদার করেছে এবং উত্তরাঞ্চলে যুদ্ধবিরতির মধ্যস্থতা করেছে। তবু রাখাইনে আরাকান আর্মির প্রভাব অব্যাহত থাকায় করিডোর বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

রাশিয়া ও ভারতের অবস্থান

রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক সহযোগিতা জোরদারের খবর প্রকাশিত হয়েছে, যা জান্তার কূটনৈতিক অবস্থানকে শক্তিশালী করেছে। অন্যদিকে ভারত, চীন ও থাইল্যান্ডসহ কয়েকটি দেশ নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ নিয়েছে। তাদের লক্ষ্য সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখা এবং অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা স্বার্থ সুরক্ষিত করা।

ভারতের জন্য মিয়ানমার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ। তবে সীমান্ত অস্থিতিশীলতা ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সক্রিয়তা প্রকল্প বাস্তবায়নে বাধা তৈরি করছে।

সংঘাতের প্রকৃতি ও বেসামরিক ঝুঁকি

রাখাইনে আরাকান আর্মির সঙ্গে সংঘর্ষে পিছিয়ে পড়ার পর সামরিক বাহিনী বিমান ও নৌ হামলা বাড়িয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে। কিয়াউকফিউ অঞ্চলে সাম্প্রতিক লড়াইয়ের পর কয়েকটি গ্রামে হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এতে বেসামরিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সংঘাতের এ ধারা অব্যাহত থাকলে নতুন করে বাস্তুচ্যুতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন: অচলাবস্থা অব্যাহত

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রশ্নে এখনো কার্যকর অগ্রগতি নেই। বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা, নাগরিকত্বের নিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক সমঝোতা—এই তিন মৌলিক শর্তের কোনোটি এখনো পূরণ হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান Atlantic Council তাদের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বর্তমান পরিস্থিতিকে কার্যত অচলাবস্থা হিসেবে উল্লেখ করেছে।

সংস্থাটির মূল্যায়ন অনুযায়ী, সামরিক তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠিত নির্বাচন অন্তর্ভুক্তিমূলক নয় এবং রাখাইনের বাস্তবতা প্রতিফলিত করে না। আরাকান আর্মির বিস্তৃত নিয়ন্ত্রণের প্রেক্ষাপটে প্রত্যাবাসিত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে কে—এ প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর নেই।

বাংলাদেশের নীতিগত প্রেক্ষাপট

১৯৭৮ সালে আরাকানে সামরিক অভিযানের পর প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সে সময় তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান সরকারের উদ্যোগে স্বল্প সময়ের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পাদিত হয়। ওই চুক্তিতে আশ্রয় নেয়া ব্যক্তিদের ‘বার্মার বৈধ বাসিন্দা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়, যা নাগরিকত্ব প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত।

বর্তমান সরকারও দ্রুত, নিরাপদ ও স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসনকে অগ্রাধিকার দিতে পারে বলে রাজনৈতিক মহলে আলোচনা রয়েছে। তবে রাখাইনে স্থিতিশীলতা না ফিরলে প্রত্যাবাসনের বাস্তবভিত্তিক অগ্রগতি সম্ভব নয় বলে পর্যবেক্ষকদের মত।

ভবিষ্যৎ কোন দিকে

মিয়ানমারে বেসামরিক কাঠামোর আড়ালে সামরিক প্রভাব বহাল থাকার সম্ভাবনা প্রবল। রাখাইন এখন কার্যত কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন এক ভূখণ্ড। সেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের দ্বৈততা, সশস্ত্র সংঘাত এবং বহিরাগত শক্তির কৌশলগত প্রতিযোগিতা মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে।

রাখাইনের ভবিষ্যৎ তাই তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছে: কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা বা রাজনৈতিক সমঝোতা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সমন্বিত অবস্থান, এবং বেসামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। এ তিনের কোনোটি স্পষ্ট না হওয়া পর্যন্ত রাখাইন সংকটের দ্রুত সমাধানের সম্ভাবনা ক্ষীণই থেকে যাচ্ছে।

Facebook
Twitter
WhatsApp
Pinterest
Telegram

এই খবরও একই রকমের

টেলিযোগাযোগ আইনে সংশোধন: ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা প্রত্যাহারসহ একাধিক পরিবর্তন

নিজস্ব প্রতিবেদক: বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ আইনে সাম্প্রতিক সংশোধনের মাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা বন্ধ করার ক্ষমতা আইনি কাঠামো থেকে প্রত্যাহারসহ একাধিক কাঠামোগত ও নীতিগত পরিবর্তন আনা হয়েছে। সংশোধিত আইনে

সিরাজগঞ্জে লাখো কণ্ঠে শপথ ও আলোচনা সভা

নজরুল ইসলাম, সিরাজগঞ্জ: জুলাই পুনর্জাগরণে সমাজগঠনে লাখো কণ্ঠে শপথ কর্মসূচির অংশ হিসেবে সিরাজগঞ্জে আলোচনা সভা, উপকারভোগীদের মধ্যে কার্ড বিতরণ এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়েছে। শনিবার

এবার রোজায় কম লোডশেডিং, আ.লীগের মন্ত্রীর কড়া সমালোচনা নাজমুলের

ডেস্ক রিপোর্ট: আওয়ামী লীগ সরকারের বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের কড়া সমালোচনা করেছেন ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম। নসরুল

রেজাউল করিমের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারে স্বস্তি খোকশাবাড়ি বিএনপিতে

নজরুল ইসলাম: সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার খোকসাবাড়ি ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ রেজাউল করিমের ওপর আরোপিত সকল দলীয় পদের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়েছে। গত মঙ্গলবার

শিয়ালকোল সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে ভিজিএফের চাল বিতরণ

নজরুল ইসলাম: সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে অসহায়,দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত পরিবারের মাঝে ভিজিএফ এর চাল বিতরণের উদ্বোধন করা হয়েছে। সোমবার

সলঙ্গায় চ্যানেল এস-এর বর্ষপূর্তি প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন

জুয়েল রানা : সব কথা, সবার কথা’-এই স্লোগানকে সামনে রেখে পরিচালিত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এস-এর বর্ষপূর্তি প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করা হয়েছে। বুধবার