আজ বৃহস্পতিবার ,১৮ই আগস্ট, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ, ৩রা ভাদ্র, ১৪২৯ বঙ্গাব্দ, ২০শে মহর্‌রম, ১৪৪৪ হিজরি (শরৎকাল)

বিকাল ৫:৫১

নতুন আলোর বাতিঘর

- Advertisement -
- Advertisement -

১২ই আগস্ট ২০১০। প্রিয় মল্লিক ভাইয়ের অনন্ত যাত্রার এইদিনে আমি খুলনা কারাগারে বন্দী। আচমকা খবর শুনে মনটা ভীষণ ব্যাথাতুর ও বিষন্ন হয়ে উঠলো। কারাগারে নিজের কক্ষে মাঝে মাঝেই বুক ভেঙ্গে আসে। দু’চোখ হয় অশ্রু বিগলিত। যতই মল্লিক ভাইকে নিয়ে ভাবতে যাই প্রচণ্ড আবেগে গেয়ে উঠিঃ

এখানে কি কেউ নেই…
আল্লাহর পথে জীবনকে বিলাবার…
এখানে কি নেই 
মালেকের মত কেউ 
এখানে কি নেই 
হামজার মত কেউ..
এখানে কি নেই 
সালাউদ্দিনের সম কেউ..
ঐ তো কাফেলা মদিনার পথে চলেছে দুর্নিবার 
ওইতো নকীব হেকে যায় শোনো আল্লাহু আকবার
মল্লিক ভাইয়ের সারা জীবনের সৌন্দর্য ছিল বিত্তবৈভব ও ঐশ্বর্যহীনতা। শয়নে স্বপনে তার সংগ্রাম ছিল আল কোরআনের সমাজ। পাশ্চাত্যের সাংস্কৃতিক নিপীড়ন আর জাহেলিয়াতের অন্ধকার দূর করে তাওহীদের নূর ছড়ানো। অপসংস্কৃতির বিপরীতে মানবতার মুক্তির জন্য ইসলামী সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা ছিলো তার জীবনের এক ও অভিন্ন লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে তিলে তিলে তার জীবনকে তিনি বিলিয়ে দিয়ে গেলেন।
অনাগত ভবিষ্যতের জন্য আমিও যখন সে নেশায় বিভোর হই তখন এক অদম্য সাহস নিয়ে মল্লিক ভাইয়ের কণ্ঠে গেয়ে উঠিঃ
 
এ আকাশ মেঘে ঢাকা রবে না,
আলোয় আলোয় হেসে উঠবে 
এ নদী গতিহীন হবেনা..
সাগরের পানে শুধু ছুটবে।
কুয়াশা তো কেটে যায় রোদ উঠলেই, 
বালিয়াড়ি ভেঙে যায় স্রোত ছুটলেই।
এসব স্বপ্ন আর আশা নিয়ে মল্লিক ভাইয়ের মায়াময় চেহারা যখন কল্পনার চোখে দেখি, ভেসে ওঠে ৭৫-৭৬ এর চঞ্চল উচ্ছল আমার জীবনে মল্লিক ভাইয়ের স্মৃতিগুলো। মল্লিক ভাইয়ের প্রাণ উজাড় করা মমতাভরা স্নেহ আর ভালবাসার স্মৃতি। সে স্মৃতি আবেগময়। অনুপ্রেরণার, ঘুম ভাঙ্গানোর সুর ঝংকার। সে স্মৃতি এক দুর্নিবার আকর্ষনে নিজেকে বিলিয়ে দেবার দৃপ্ত শপথের। 
মনে পড়ে কোন এক সকালে আমাকে বাড়িতে না পেয়ে আমার রুমের দরজার শিকলে লটকানো এক টুকরো কাগজে মল্লিক ভাইয়ের লেখা তার কাব্যিক মনের এমন অভিব্যক্তির কথা..
 
পরওয়ার ভাই, 
এসেছিলাম
চলে গেলাম
আপনাকে পেলাম না তাই!
আমার সাংগঠনিক জীবনে তার আগমন ছিল যাদুর পরশের মত। যাদের টানে আমি আলোর এ পথ পেয়েছিলাম তাদের মধ্যে মল্লিক ভাই অন্যতম। 
নিঃশব্দ নিরব প্রচারবিমুখ অসাধারণ আখলাকের অধিকারী ছিলেন এই খোদার সৈনিক। মানুষকে কাছে টানতেন তার প্রচন্ড আত্মিক শক্তি দিয়ে। আন্দোলনের একশ্রেণীর নেতাকর্মীরা সারা জীবন তার সান্নিধ্যে ছুটতো তার জীবনের আধ্যাত্মিক ছোয়া পেতে।
ইবনে সিনা হাসপাতালের কেবিনে অসুস্থ মল্লিক ভাইকে দেখতে গেলাম। বললাম মল্লিক ভাই, বাড়ির গাছের পেয়ারা এনেছি আপনার জন্য। শোয়া অবস্থায় নড়েচড়ে আগ্রহ নিয়ে বললেন- “আমি খুব পছন্দ করি, ছোট ছোট করে কেটে দিন।”  দিলাম এবং তৃপ্তি সহকারে খেলেন। বেডে মল্লিক ভাইয়ের পাশে বসে অনেক কথা। কথার মধ্যে উদ্বেগ নেই, অসুস্থতার পরিণতি নিয়ে নেই কোন দুশ্চিন্তা। বরং দারুন প্রত্যয় দীপ্ত।
অসুস্থ মল্লিক ভাইয়ের চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যাওয়া এবং তার শারীরিক বিষয় নিয়ে মাঝে মাঝে সাইফুল আলম খান মিলন ভাইয়ের কাছ থেকে ফোনে খোঁজ খবর নিতাম। চিকিৎসার ব্যাপারে দায়িত্বপ্রাপ্ত মিলন ভাই নিজেও মাঝে মাঝে ফোন করে অনেক কিছু জানাতেন। কিডনী ট্রান্সপারেন্ট ও খুলনার সিদ্দিক হেলাল ভাইয়ের ছেলে আহসানউল্লাহর কিডনি দানের পরিকল্পনা ইত্যাদি নিয়েও অনেক কথা হতো। এজন্য শারীরিক উপযুক্ততার অপেক্ষা চলছিলো। মহান আল্লাহ সেই অপেক্ষার অবসান করে দিলেন তার দরবারে ডাক দিয়ে। 
মুহতারাম আমীরে জামায়াত শহীদ মতিউর রহমান নিজামী ভাই চিকিৎসার জন্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা এবং পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। ভেবেছিলাম আল্লাহপাক তার এ বান্দাহকে আন্দোলনের প্রয়োজনে সুস্থ ও কর্মক্ষম করে দেবেন। কিন্তু বান্দাহর কোন চাওয়া পূরণ হয়না আল্লাহর ইচ্ছা ছাড়া।
হে আল্লাহ,
আমার প্রিয় মল্লিক ভাই গোটা জীবন দিয়ে তার কণ্ঠ দিয়ে সুর দিয়ে মেধা ও প্রতিভা দিয়ে সত্যের যে সাক্ষ্য পেশ করে গেছেন তা তুমি কবুল করে নাও। 
তাকে তুমি শহীদের মর্যাদা দান কর।
প্রায় ৩ যুগ ধরে পাশ্চাত্য ও অপসংস্কৃতির বিরুদ্ধে মল্লিক ভাই সুস্থ ও আদর্শিক সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নতুন ধারা সৃষ্টি করে ফুলে ফলে বিকশিত করেন। তা আজ মহীরুহে পরিনত হয়ে দিগন্ত বিস্তৃত। গানে গানে আজ মল্লিক যেন বিশ্বময়। মল্লিকভাই সে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের নতুন ধারার প্রাণপুরুষ। 
সাংস্কৃতিক আন্দোলনে তিনি ছিলেন পাশ্চাত্য ও ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতির বিপরীতে মানবতার মুক্তিকামী ইসলামি সংস্কৃতির নতুনধারার স্রষ্টা। সর্বনাশা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির মোকাবেলায় এক নতুন সংস্কৃতির আলো তিনি জ্বালিয়েছিলেন। নতুন আলোর তিনি এক বাতিঘর। ছড়িয়ে গেলো সে আলো সবখানে।
একদিন মল্লিক ভাই খুলনার শহীদ সাংবাদিক শেখ বেলাল ভাইয়ের বাড়িতে তার আম্মাকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে বলেছিলেন, “এদেশের শিক্ষা আন্দোলনের প্রথম শহীদ মালেক ভাই, আর সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রথম শহীদ বেলাল ভাই।” 
আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করি, 
“হে আল্লাহ! তুমি শহীদ সাংবাদিক বেলাল ভাইয়ের এবং শত সহস্র সংস্কৃতি কর্মীদের উস্তাদ মল্লিক ভাইকে হাকীকি শহীদ হিসেবে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করো।”  আমিন।
- Advertisement -

সর্বশেষ খবরঃ

- Advertisement -

আপনার জন্য আরো খবর

উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে